সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ছাত্রলীগের ব্যাপক হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে শুধু একটি দিনেই আহত হন প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী।
সকালে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর দুপুরের পর থেকে শুরু হয় হামলার ঘটনা। বিজয় একাত্তর হলের সামনে সংঘর্ষের সূচনা হলে দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রড, হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। অনেকে বাসের ভেতর আশ্রয় নিলেও রক্ষা পাননি।
রক্তাক্ত শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা নিতে গেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটেও হামলার শিকার হন। সন্ধ্যার পর শহীদুল্লাহ্ হলের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
‘রাজাকার’ ইস্যু ও উত্তপ্ত আগাম রাত
১৪ জুলাই বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ হিসেবে কটাক্ষ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। ওই রাতেই শত শত শিক্ষার্থী ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হন।
পরদিন সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, “আন্দোলনকারীদের ঔদ্ধত্যের জবাব ছাত্রলীগই দেবে।” ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যারা নিজেদের রাজাকার বলেছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়ব।”
এই বক্তব্যগুলো যেন ইঙ্গিতবাহী হয়ে দাঁড়ায়। দুপুর গড়াতেই দেশের নানা প্রান্তে ছাত্রলীগের হামলা শুরু হয়।
ঢাবি ছাড়িয়ে আগুন ছড়ায় সারা দেশে
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে ৫ জন আহত হন।
- জাহাঙ্গীরনগরে কয়েক দফা হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হন, আগের রাতেই ক্যাম্পাসে চালানো হয় অস্ত্রধারী হামলা।
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’দফায় হামলায় আহত হন অন্তত ১০ শিক্ষার্থী।
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, এম এম কলেজ (যশোর), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
- ইডেন মহিলা কলেজে মিছিল ঠেকাতে কলেজ গেটে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধর করেন ছাত্রলীগ নেত্রীরা।
এছাড়া রাজধানীর নতুনবাজার, কুড়িল বিশ্বরোডে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগের সঙ্গে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হল প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশ দেন রাতভর হলে অবস্থান করতে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য।
তবে হামলার সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। মেডিকেলে আহতদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রমাণ হয়েছে, কোথাও আমরা নিরাপদ নই।”
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও বিতর্ক
শেখ হাসিনা ১৫ জুলাই বলেন, “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। নিজেদের রাজাকার বলতেও লজ্জা করে না!” পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আন্দোলনকারীদের “এ যুগের রাজাকার” বলে আখ্যা দেন।
এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনকারীরা ১৬ জুলাই দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হবে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করছি।”
উপসংহার
২০২৪ সালের ১৫ জুলাই দেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ত এক অধ্যায় হয়ে থাকবে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীদের ওপর এমন দমন-পীড়নের নজির নতুন নয়, তবে এবারের হামলা, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং সমন্বিত হামলার ধরন গভীর প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা, রাজনৈতিক নৈতিকতা ও শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতা নিয়ে।






