টানা আট বছর গুম থাকার পর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। জানালেন, জেআইসি-র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ছারপোকার কামড়, রক্তাক্ত কাপড় এবং ছেঁড়া লুঙ্গিতে গিট্টু দিয়ে পার করা সেই ২,৯০৮ দিনের করুণ কাহিনী।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম হয়ে বছরের পর বছর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানোর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি জেআইসি-তে (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল) কাটানো অমানবিক দিনগুলোর চিত্র তুলে ধরেন।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মরহুম গোলাম আজমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী জানান, তাকে এমন এক নরকতুল্য পরিবেশে রাখা হয়েছিল যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকাই ছিল দুষ্কর।
ছারপোকার রাজত্ব ও রক্তাক্ত নামাজ
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আযমী বলেন, তাকে ঘুমানোর জন্য যে তোষক দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল শত শত ছারপোকায় ভরা। রাতে ছারপোকার কামড়ে শরীর রক্তাক্ত হয়ে যেত। সেই রক্তমাখা অপবিত্র কাপড়েই তাকে বাধ্য হয়ে নামাজ আদায় করতে হতো। তিনি নামাজের জন্য বারবার পরিষ্কার কাপড় চাইলেও তা দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পরনের লুঙ্গিটি ছিঁড়ে গিয়েছিল। বারবার সেলাই করতে করতে একপর্যায়ে দর্জিও বিরক্ত হয়ে পড়েন। পরে আমি নিজেই সুই-সুতা চেয়েছিলাম সেলাই করার জন্য, কিন্তু তারা তাও দেয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া লুঙ্গিতে গিট্টু দিয়ে ইজ্জত আব্রু রক্ষা করতে হয়েছে।”
২,৯০৮ দিন দেখেননি সূর্য-চন্দ্র
গুম জীবনের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করে ৬৭ বছর বয়সী সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “বন্দী জীবনের ২,৯০৮ দিন আমি আকাশ দেখিনি। দেখিনি চাঁদ-সূর্য, মেঘ-বৃষ্টি কিংবা গাছপালা। মাটির স্পর্শও পাইনি। এক অকল্পনীয় ও অমানুষিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আমাকে প্রতিটি মুহূর্ত পার করতে হয়েছে।”
২০১৬ সালের সেই কালরাতের বর্ণনা
জবানবন্দিতে নিজের অপহরণের ঘটনা তুলে ধরেন আযমী। তিনি জানান, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে ঢাকার বড় মগবাজারের বাসা থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে একাধিক মাইক্রোবাসে করে ৫০-৬০ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তার বাসায় হানা দেয়।
তিনি বলেন, “তারা কোনো পরিচয়পত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখায়নি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, শারীরিক নির্যাতনের ভয়ে আমি তাদের হাতে হাতকড়া পরতে বাধ্য হই। এরপর চোখ বেঁধে এবং যমটুপি পরিয়ে আমাকে গাড়িতে তোলা হয়।”
অপহরণকারী দলে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মকছুরুল নামের এক ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে তিনি শনাক্ত করেছিলেন উল্লেখ করে জানান, ওই কর্মকর্তা তার সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন আচরণ করেছিলেন।
বিনা বিচারে চাকরিচ্যুতি ও শেখ হাসিনার বিচার
সেনাবাহিনীতে ১৯৮১ সালে কমিশন লাভ করা আযমী অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করে। বাতিল করা হয় পেনশনসহ সব সুযোগ-সুবিধা। এমনকি সেনানিবাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যা ছিল নজিরবিহীন।
জেআইসিতে সংঘটিত এসব গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
পরবর্তী শুনানি
সোমবার আযমীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যক্রম মুলতবি করেছে। ওইদিন তাকে জেরা করা হবে। উল্লেখ্য, গত ১৮ ডিসেম্বর এই মামলার অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়।






