কলকাতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু আইসিসিআর (ICCR)-এর মিলনায়তন সাক্ষী হলো এক নজিরবিহীন ঘটনার। সাহিত্য আলোচনার মোড়কে আয়োজিত এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বোমা ফাটালেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।
বক্তব্যে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান এবং সেই সময়কার হত্যাকাণ্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। জয় স্বীকার করেছেন যে, আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অধিকাংশ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু একটি ‘ভুল’ ছিল। তার এই মন্তব্য এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে করা কটাক্ষ কলকাতার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কী বললেন সজীব ওয়াজেদ জয়?
‘খোলা হাওয়া’ নামক একটি সংগঠনের আয়োজনে ওই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দেন শেখ হাসিনার পুত্র। তিনি বলেন, “জুলাইয়ের আন্দোলনে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যে প্রাণহানি হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। এটা আমাদের ভুল ছিল।” পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মন্তব্যও করেন তিনি। সাহিত্যসভায় এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ায় উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েন।
কলকাতার রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
জয়ের এই ভাষণ কেবল মিলনায়তনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং কলকাতার রাজনৈতিক আঙিনায় উত্তাপ ছড়িয়েছে।
- তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষোভ: পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “কলকাতা ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। এখানে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভিনদেশের বিতর্কিত রাজনৈতিক ভাষণ কাম্য নয়। এটি শহরের শান্ত পরিবেশ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
- বিজেপির অবস্থান: অন্যদিকে, বিজেপির প্রতিনিধি পঙ্কজ রায় বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, “বই প্রকাশনা হলেও যদি তার প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক হয়, তবে সেখানে রাজনৈতিক আলোচনা আসতেই পারে। আমরা সুস্থ বিতর্কে বিশ্বাসী।”
- বামপন্থীদের সতর্কতা: সরকার সমর্থিত এক বাম রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলার আগে দুই দেশের সম্পর্কের কথা মাথায় রাখা উচিত।
বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের হতাশা
কলকাতার বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত ঘোষাল মনে করেন, অনুষ্ঠানটি সাহিত্যের হলেও জয়ের বক্তব্যের কারণে এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে, স্বাধীন নির্মাতা ও লেখক দীপ হালদার আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে এসেছিলাম, কিন্তু রাজনীতির উচ্চস্বরে সাহিত্যটাই চাপা পড়ে গেল।”
আয়োজকদের সাফাই
বিতর্কের মুখে আয়োজক সংগঠন ‘খোলা হাওয়া’ জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। তাদের দাবি, বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্র ছিল, তাই বক্তার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উঠে আসা স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই ভার্চুয়াল উপস্থিতি কলকাতার শান্ত সাংস্কৃতিক আবহে নতুন এক রাজনৈতিক ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।





