ঢাকা   রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

৩০ সীমান্ত দিয়ে স্রোতের মতো ঢুকছে অস্ত্র: নির্বাচনের আগে ভয়াবহ ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ফাঁস!

Authorরেডিও বার্তা অনলাইন

আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

৩০ সীমান্ত দিয়ে স্রোতের মতো ঢুকছে অস্ত্র: নির্বাচনের আগে ভয়াবহ ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ফাঁস!
ছবি প্রথম আলো

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার এক ভয়ংকর নকশা বাস্তবায়নে নেমেছে একাধিক অপরাধী চক্র। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে ভারত ও মিয়ানমারের অন্তত ৩০টি অরক্ষিত পয়েন্ট দিয়ে দেদারসে ঢুকছে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র। খোদ রাজধানীর বুকে একের পর এক অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব অস্ত্র চলে যাচ্ছে অসাধু রাজনৈতিক নেতা, শীর্ষ সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী এবং পেশাদার অপরাধীদের হাতে। উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের মাঠে সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার এবং রক্তপাত।

রাজধানীতে অস্ত্রের মজুত ও সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তার
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে সন্ত্রাসীরা। গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর বুকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ২১ রাউন্ড গুলিসহ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হন মো. আজগর আলী ওরফে ভোলা (৫৫)। জিজ্ঞাসাবাদে এই অস্ত্র কারবারি জানান, ভারতের সীমান্ত থেকে যশোরের বেনাপোল রুট ব্যবহার করে এই পিস্তলগুলো বিক্রির জন্য ঢাকায় আনা হয়েছিল।

এর ঠিক আগেই, গত ১ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন টোল ঘর এলাকায় এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে পুলিশ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ রয়েল হাসান নামের আরেক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, ভারত থেকে মনাকষা সীমান্ত দিয়ে ওই অস্ত্রটি রয়েলের হাতে পৌঁছেছিল।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গ্রেপ্তারকৃতরা মূলত ‘ক্যারিয়ার’ বা বাহক। তারা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে সীমান্তের ওপার থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্র এপারে নিয়ে আসে। এরপর তা হাতবদল হয়ে চলে যায় মূল হোতাদের কাছে।

মানচিত্রে চিহ্নিত অস্ত্র চোরাচালানের ভয়ংকর ৩০ রুট
বিজিবি, পুলিশ ও র‍্যাবের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০টি পয়েন্ট এখন অস্ত্র পাচারকারীদের জন্য ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে যে পয়েন্টগুলোর নাম উঠে এসেছে তা শিউরে ওঠার মতো:

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা: শিবগঞ্জের রহনপুর, রাঘব বাটি, গোপালপুর, মনাকষা, সোনামসজিদ, আজমতপুর ও বিলভাতিয়া।
  • যশোর ও সাতক্ষীরা: বেনাপোল, চৌগাছা, কলারোয়ার তলুইগাছা ও শাঁকারা সীমান্ত।
  • রাজশাহী অঞ্চল: গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত।
  • সিলেট ও সুনামগঞ্জ: কানাইহাট, জৈন্তাপুরের মিনাটিলা, জাফলংয়ের কাটরি, ছনবাড়ি বাজার ও চারাগাঁও।
  • পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফের খড়ের দ্বীপ ও উখিয়া।
  • অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট: ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, মেহেরপুর, কুমিল্লার সরাইল, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরচিলামারী, দিনাজপুরের গিলবাড়ি এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখার তারাদরম সীমান্ত।

কৌশল পাল্টেছে মাফিয়ারা: টোপ দিয়ে পার করা হচ্ছে বড় চালান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, অস্ত্র কারবারিরা এখন নতুন ও ধূর্ত কৌশল নিয়েছে। তারা স্থলপথের পাশাপাশি মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকার খোলে লুকিয়ে নদীপথেও অস্ত্র আনছে। চোরাকারবারিরা প্রথমে এসব অস্ত্র নিজেদের গোপন ডেরায় মজুত করে, পরে সুবিধামতো সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয়।

সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, চোরাকারবারিরা পুলিশের নজর সরানোর জন্য ‘ডাইভারশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তারা জেনেশুনেই ছোট একটি অস্ত্রের চালান পুলিশের সোর্সের মাধ্যমে ধরিয়ে দেয়। পুলিশ যখন সেই অভিযান, আসামি ও মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ঠিক সেই সুযোগে অন্য রুট দিয়ে বড় চালানগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ঢাকার মধ্য বাড্ডার বেপারিপাড়ার এক বাড়ি থেকে গতকাল আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দলছবি: ডিএমপির সৌজন্যে

লুট হওয়া ৫ হাজার অস্ত্র ও নির্বাচনকেন্দ্রিক শঙ্কা
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সে সময় ৫ হাজার ৮১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যদিও ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ২ হাজার ৩৯৩টি মামলা হয়েছে, তবুও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা শঙ্কিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, “পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং সীমান্তের নতুন অস্ত্রের চালান—এই দুইয়ের মিশেল দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ঢোকা মানে হুমকি আরও বেড়ে যাওয়া। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে সীমান্ত নিশ্ছিদ্র করার এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।”

চলছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র
নির্বাচনী সহিংসতা রোধে যৌথ বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান বিন হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। ওই হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি ছিল বিদেশি। তার মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলাও চালানো হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-এ ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫ হাজার ৯৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সময়ে উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি অস্ত্র। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বড় মাপের গডফাদার বা পেশাদার সন্ত্রাসীর সংখ্যা খুবই কম।

যৌথ বাহিনীর বড় সাফল্য: সুব্রত বাইনের সহযোগী গ্রেপ্তার
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার পোস্ট অফিস গলির একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী বড় সাফল্যের দেখা পায়। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান দিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, পিস্তল ও রিভলভার। এটি প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসীরা বড় ধরনের সহিংসতার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিজিবি ও পুলিশের কঠোর হুঁশিয়ারি
৩০ ডিসেম্বর বিজিবি দিবসে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমান্তে নজরদারি সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান জানান, বিজিবি সীমান্তের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। ফলে রাজশাহীতে শুক্রবারও অস্ত্রের চালানসহ মাদক ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বিজিবি তৎপর থাকায় সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকার সময়ই অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে।”

অন্যদিকে, পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম জানান, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে বলেই দেশের ভেতরে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে লুট হওয়া অস্ত্র ও কারাগারের অস্ত্র নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সীমান্তের এই ৩০টি পয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ‘গান রুট’ বন্ধ করে কতটা নিরাপদ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!