ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় টিকিট পেতে তুমুল দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপির নেত্রীরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের পাশাপাশি সাবেক ছাত্রদল নেত্রীরাও এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী আসন পেয়ে চমকপ্রদ প্রার্থী তালিকা তৈরি করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রেডিও বার্তা-এর পাঠকদের জন্য সংরক্ষিত নারী আসনের হালচাল ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
আসন বণ্টনের সমীকরণ: কে কয়টি পাচ্ছে?
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০টি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয়জন নির্বাচিত সাধারণ সংসদ সদস্যের বিপরীতে একটি নারী আসন বরাদ্দ হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। সেই আনুপাতিক হিসাবে বিএনপি পেতে যাচ্ছে ৩৫টি নারী আসন।
এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ১১টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১টি আসন। বাকি ৩টি আসন গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্রভাবে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক হারে বা লটারির মাধ্যমে বণ্টিত হবে।
বিএনপিতে নবীন-প্রবীণের লড়াই, বায়োডাটা জমার হিড়িক
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নারী আসনে এবার নবীন ও প্রবীণ নেত্রীদের এক দারুণ সমন্বয় দেখা যাবে। বিগত দিনে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় আনুগত্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতা প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বায়োডাটা বা প্রোফাইল তৈরি করছেন নেত্রীরা। অনেকেই সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও দলের হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া ঈদের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সম্ভাব্য তালিকায় যারা এগিয়ে
বিএনপির দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেত্রীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন— মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, শাম্মী আখতার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, নিলুফার চৌধুরী মনি প্রমুখ। এছাড়া শাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইনও জোরালো আলোচনায় আছেন।
মনোনয়নের বিষয়ে সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন বলেন, “আমরা কোনো অযাচিত দৌড়ঝাঁপ করছি না। তবে যারা সত্যিকার অর্থে এই পদের দাবিদার এবং যোগ্য, দল নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে।”
অন্যদিকে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী মনে করেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ্য ও ত্যাগী নেত্রীদেরই সংসদে পাঠাবেন, যারা নারীর ক্ষমতায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।”
ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীদের শক্ত অবস্থান
এবার মহিলা দলের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক ছাত্রদল নেত্রীরাও শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে আসমা আজিজ, সুলতানা জেসমিন জুঁই, নাসিমা আক্তার কেয়া, রোকেয়া চৌধুরী ও সুরাইয়া বেগম দলের হাইকমান্ডের কাছে নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।
সাবেক ছাত্রদল নেত্রী সুলতানা জেসমিন বলেন, “রাজনীতিতে শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও যোগ্যতারও সংমিশ্রণ থাকা উচিত।”
জামায়াতের তালিকায় শিক্ষক ও চিকিৎসকদের প্রাধান্য
দলীয় ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ ১১টি নারী আসন পেতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯১ সালে দুটি এবং ২০০১ সালে চারটি আসন পেয়েছিল দলটি। দলীয় সূত্র জানায়, এবার পেশাজীবী নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি খসড়া তালিকা করছে দলের মহিলা বিভাগ।
সম্ভাব্য তালিকায় আলোচনায় আছেন— নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, মার্জিয়া বেগম এবং ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মারদিয়া মমতাজ। চমক হিসেবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কোনো নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন উপযুক্ত নারীদেরই তারা বেছে নেবেন।
এনসিপি ও অন্যান্যদের প্রস্তুতি
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১টি আসনের বিপরীতে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম মিতুর নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে।
কবে বসছে সংসদ?
আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের গেজেট (১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত) প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির নতুন সংসদের অধিবেশন ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী ১৪ মার্চের মধ্যেই প্রথম অধিবেশন বসতে হবে। আর সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে।
ত্রয়োদশ সংসদে সরাসরি ভোটে ৭ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন (৬ জন বিএনপির, ১ জন স্বতন্ত্র)। সংরক্ষিত ৫০টি আসন পূর্ণ হলে সংসদে মোট নারী সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৭ জনে, যা ৩৫০ সদস্যের পুরো সংসদের প্রায় ১৬ শতাংশ।






