ঢাকা   শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় সারাদেশ এক সময়ের কঠোর নকলবিরোধী মিলন, এখন কেন বিতর্কে?

Authorইসমাইল হোসেন

আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

<span class="nhu-kicker" style="--nhu-color:#ff0000;">শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় সারাদেশ</span><span class="nhu-sep">•</span> এক সময়ের কঠোর নকলবিরোধী মিলন, এখন কেন বিতর্কে?
শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন

একসময়ের দাপুটে শিক্ষামন্ত্রী, যিনি নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সারাদেশে রীতিমতো হিরো বনে গিয়েছিলেন, তিনি আজ কী করছেন? কেন ক্লাস ওয়ান-টুর ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনে গিয়ে হঠাৎ করে রাজনৈতিক নেত্রীর নাম মুখস্থ করাচ্ছেন? কেনই বা আবার সেই অভিশপ্ত অনলাইন ক্লাস ফিরিয়ে এনে শিক্ষাব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছেন? এহসানুল হক মিলন, যাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং যোগ্য শিক্ষামন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মানা হতো, তার আজকের এই আচরণের পেছনের আসল রহস্য কী? তবে কি তিনি তার যোগ্যতার চূড়ান্ত শিখর বা ‘অপটিমাম লেভেল’ পার করে এখন শুধুই নিচের দিকে নামছেন? আজ আমরা মেলাবো ২০০১ সালের সেই বাঘের মতো গর্জন করা মিলন, আর আজকের এই পদে পদে বিতর্কে জড়ানো মিলনের আকাশ-পাতাল পার্থক্যকে।

বিজ্ঞানে একটি দারুণ শব্দ আছে— ‘অপটিমাম লেভেল’ বা সর্বোচ্চ চূড়া। এই লেভেলটা হলো এমন একটা পর্যায়, যেখানে পৌঁছানোর পর আর উপরে ওঠার কোনো সুযোগই থাকে না। উপরে উঠতে গেলেই পতন অনিবার্য, আবার নিচে নামাও যায় না। যেমন ধরুন, আপনি আগুনে পানি গরম করছেন। ফুটতে ফুটতে পানি যখন তার সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় বা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন আপনি যতই জ্বালানি দিন না কেন, পানি আর গরম হবে না, বরং তা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। এহসানুল হক মিলনের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষা বিশ্লেষকরা।

একটু পেছনে ফিরে তাকাই। যারা নব্বই দশক বা তার আশেপাশে পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সারাদেশে নকলের কী ভয়াবহ এক উৎসব চলছিল। নকল যেন এক ক্যান্সারের মতো গ্রাস করেছিল আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে। এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। শিক্ষামন্ত্রী হন ড. ওসমান ফারুক, আর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আজকের এই এহসানুল হক মিলন। দায়িত্ব পেয়েই তিনি যেন এক জাদুকরের মতো পাল্টে দিলেন সব দৃশ্যপট। সারাদেশের পরীক্ষার হলগুলোতে তিনি ঝড়ের মতো ছুটে বেড়াতেন। তার ভয়ে নকলবাজদের শিরদাঁড়া কেঁপে উঠতো। নকল প্রতিরোধে তিনি যে অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও এদেশের মানুষ চরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সে সময়ে তিনি তার জনপ্রিয়তা এবং যোগ্যতার একদম অপটিমাম লেভেল বা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।

২০০৬ সালের পর থেকে এহসানুল হক মিলনের জনপ্রিয়তার সেই গ্রাফটা আর উপরের দিকে ওঠেনি। বরং একটা দীর্ঘ নির্দিষ্ট সময় স্থির থাকার পর এখন তা ক্রমশ নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বয়স বেড়েছে, সেই সাথে হয়তো কমেছে তার সেই তীক্ষ্ণ বিচারবোধ ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। তাই তো দীর্ঘ সময় পর যখন তিনি আবারো শিক্ষাখাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন, তখন এদেশের মানুষ বুক বেঁধে আশা করেছিল সেই পুরনো মিলনের একটি ঝলক দেখার। কিন্তু মানুষ দেখল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মিলনকে। একের পর এক বিতর্কিত এবং জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি এখন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই তিনি ঘোষণা দিলেন, দেশে জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে আবারো ছাত্র-ছাত্রীদের অনলাইন ক্লাসে ফিরে যেতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি শুনেই রীতিমতো শিউরে উঠেছিল দেশের অভিভাবক মহল। কারণ, করোনার সময় এই অনলাইন ক্লাসের যে কতটা নেতিবাচক প্রভাব এদেশের শিশু-কিশোরদের উপর পড়েছে, তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ছাড়া আর কেউ ভালো বোঝে না। অনলাইন ক্লাসের নামে বাচ্চাদের হাতে যে স্মার্টফোন তুলে দেয়া হয়েছিল, তার ফলে পড়াশোনার চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়েছে। বেশিরভাগ শিশুই পড়াশোনা বাদ দিয়ে স্মার্টফোনে গেম আর ইন্টারনেটে চরমভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এখন দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয় না ঠিকমতো। শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে কোচিংয়ে পড়াতে বেশি আগ্রহী। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই কোচিং আর প্রাইভেট নির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রাইভেট বা কোচিং না পড়লে এখন আর কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে পাস করা বা ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব নয়। এমন এক ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন আশা করছিল নতুন সরকার এসে এই অচল অবস্থা কাটাবেন, শিক্ষার্থীদের আবার ক্লাসমুখী করবেন, শিক্ষার হারানো মান ফিরিয়ে আনবেন, ঠিক তখন এহসানুল হক মিলন এসে আবারো সেই অনলাইন ক্লাসের দিকেই বাচ্চাদের ঠেলে দিলেন। শিক্ষাব্যবস্থার এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে এমন একটি অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা তৈরি করেছে।

তবে শুধু অনলাইন ক্লাসের ঘোষণাতেই তিনি থেমে থাকেননি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি ভিডিও রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে, যা দেখে দেশের আপামর জনসাধারণ হতবাক। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এহসানুল হক মিলন কোনো একটি স্কুলে গিয়েছেন এবং একেবারে ক্লাস ওয়ান বা টুর ছোট ছোট কোমলমতি বাচ্চাদের সামনে বসে কথা বলছেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি হঠাৎ করেই ওই অবুঝ বাচ্চাদের কাছে জানতে চান, “তোমরা কি জাইমা রহমানকে চেনো?” বাচ্চারা যখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো উত্তর দিতে পারছিল না, তখন তিনি নিজেই পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, “জাইমা রহমান হলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি এবং তারেক রহমানের মেয়ে।” শুধু পরিচয় দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি ওই অবুঝ শিশুদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে নেড়ে বললেন, “তোমরা রাজনীতি করবা জাইমা রহমানের সাথে।” এই কথাটি তিনি এমন ছোট বাচ্চাদের বলেছেন, যাদের রাজনীতি, দেশ বা শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণাই নেই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন দায়িত্বশীল শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এমন আচরণ কতটা যৌক্তিক? তিনি জাইমা রহমানকে নিয়ে কথা বলতেই পারেন। জাইমা রহমান একটি বিশাল বড় রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, তার প্রতি মিলনের ব্যক্তিগত আনুগত্য, স্নেহ বা শ্রদ্ধা থাকতেই পারে। তিনি দলের শীর্ষ নেতাদের খুশি করার জন্য প্রশংসা করতেই পারেন। সেটা তার একান্তই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিরুচি। কিন্তু সেই রাজনীতির পাঠ তিনি কোথায় দিচ্ছেন? একেবারে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে! যেই বয়সে শিশুদের শেখার কথা নীতি-নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম আর মূল্যবোধের গল্প, সেই বয়সে তাদের কাঁচা মগজে জোর করে রাজনৈতিক নামের বীজ বপন করা হচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞরা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা স্পষ্ট করেই বলছেন, শিশুদের অবুঝ মনের ওপর এই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞান অর্জনের জায়গা, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারণার মঞ্চ নয়।

আসলে মানুষ যখন তার সেই অপটিমাম লেভেল বা সেরা সময়টা পার করে নিচের দিকে নামতে থাকে, তখন সে নিজেই বুঝতে পারে না সে কী করছে, তার কী করা উচিত। নিজের হারিয়ে যাওয়া প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে বা নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় মানুষ এমন সব বেফাঁস কাজ করে বসে, যা তার অতীতের সব সোনালী অর্জনকে ম্লান করে দেয়। একটি অচল পয়সার যেমন বাজারে কোনো দাম থাকে না, তেমনি যোগ্যতার পারদ নিচে নেমে গেলে মানুষ অযাচিতভাবে তোষামোদ আর চাটুকারিতার আশ্রয় নেয়। এহসানুল হক মিলনের ক্ষেত্রেও কি আজ ঠিক সেটাই ঘটছে? যে মানুষটা একদিন নিজের দাপটে, নিজের কর্মগুণে সারাদেশের মানুষের কাছে হিরো ছিলেন, তাকে কেন আজ ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনে গিয়ে রাজনৈতিক তোষামোদের মাধ্যমে লাইমলাইটে থাকতে হবে? বাংলাদেশের মানুষ সবসময় একজন সৎ, যোগ্য এবং সাহসী এহসানুল হক মিলনকে মনে রাখতে চায়। সেই মিলন, যিনি পরীক্ষার হল থেকে বুক ফুলিয়ে নকলবাজদের কান ধরে বের করে দিতেন। কিন্তু আজকের এই মিলন, যিনি শিক্ষার মান উন্নয়নের বদলে শিশুদের রাজনৈতিক মগজ ধোলাইয়ে ব্যস্ত এবং অনলাইন ক্লাসের মতো চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাকে এদেশের সচেতন নাগরিকরা কতটা মেনে নেবে, তা সময়ই বলে দেবে। একজন যোগ্য মানুষের হাতে দায়িত্ব পড়লে জাতি যেমন আনন্দিত হয়, তেমনি সেই মানুষের অপ্রত্যাশিত আচরণে জাতি ততটাই হতাশ হয়। এহসানুল হক মিলনের বর্তমান এই আচরণগুলো সেই তীব্র হতাশারই প্রতিচ্ছবি।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!