নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ঘিরে গড়ে ওঠা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো এখন কার্যত এক অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে অদক্ষ জনবল, নিম্নমানের রিএজেন্ট ও তদারকির অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে ভুল রিপোর্ট, আর তারই খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে।
সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় বিষয়টি ভয়াবহ আকারে সামনে এসেছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা গভীরভাবে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এরই মধ্যে ৭ বছর বয়সী শিশু সোহানের ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ডিমলা স্কয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে রক্তে আরবিএস ১২.৬ এবং ইউরিনে সুগার পজিটিভ দেখিয়ে শিশুটিকে ডায়াবেটিস রোগী হিসেবে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এমন রিপোর্ট হাতে পেয়ে পরিবারে নেমে আসে চরম আতঙ্ক। দেরি না করে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে রংপুরে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৬ এপ্রিল রংপুরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পুনরায় পরীক্ষা করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। খালি পেটে রক্তে সুগার ৩.৭০ এবং খাবারের দুই ঘণ্টা পর ৪.২৮। একইভাবে ইউরিন পরীক্ষাতেও ডায়াবেটিস নেগেটিভ আসে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রথম রিপোর্টটি ছিল ভুল এবং ভিত্তিহীন। একটি শিশুকে অযথা গুরুতর রোগী বানিয়ে পরিবারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শিশুটির পিতা আহিনুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি নিছক ভুল নয়, এটি সরাসরি গাফিলতি। ভুল রিপোর্টের কারণে আমরা চরম আতঙ্কে ছিলাম এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করতে হয়েছে।”
অন্যদিকে, জন্ডিস রোগ নির্ণয়কে কেন্দ্র করে আরও উদ্বেগজনক একটি ঘটনা সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর ১৫ এপ্রিল একই দিনে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের ব্যবধানে সোহেল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডিমলা স্কয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রক্ত পরীক্ষা করান। কিন্তু তিনটি প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল। ডিমলা স্কয়ার ক্লিনিকে বিলিরুবিন ২৬.২, সোহেল ডায়াগনস্টিকে ১০.৫ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২.৫। একই রোগীর ক্ষেত্রে এত বড় ব্যবধান চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। এতে রোগী ও তার স্বজনরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েন। কোন রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা নেবেন, তা নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা।
এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাব টেকনোলজিস্ট কবীর হোসেন জানান, “মেশিন ও রিএজেন্টের কারণে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে, তবে ১০.৫ ও ১২.৫ কাছাকাছি হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য, ২৬.২ রিপোর্টটি সন্দেহজনক।”
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, “এত বড় পার্থক্য স্বাভাবিক নয়, এটি টেকনোলজিস্টের গাফিলতি বা রিএজেন্টের ত্রুটির ফল হতে পারে।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো নিজেদের ভুল স্বীকার না করে বরং নিজেদের রিপোর্টকেই সঠিক বলে দাবি করছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে।
এসব নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরই মানসম্মত ল্যাব সুবিধা নেই, নেই প্রশিক্ষিত জনবল বা নিয়মিত তদারকি। রোগ নির্ণয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে পুঁজি করে চলছে এক ধরনের ‘টেস্ট বাণিজ্য’, যেখানে রোগীর জীবন ও নিরাপত্তা গৌণ হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন- ভুল রিপোর্ট মানেই ভুল চিকিৎসা, আর ভুল চিকিৎসা মানেই সরাসরি জীবনহানির ঝুঁকি। অথচ এমন গুরুতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারির অভাব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
ডিমলার এই চিত্র শুধু একটি উপজেলার সংকট নয়, বরং দেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর দুরবস্থার প্রতিফলন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভুল রিপোর্টের এই নীরব বিপর্যয় যে কোনো সময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






