শরীয়তপুরের জাজিরায় সরকারি অফিসের সময়সূচি মেনে ও নামের পাশে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে দীর্ঘ তিন বছর ধরে চিকিৎসাবাণিজ্য চালিয়ে আসছেন মোঃ মাসুদ রানা নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে পল্লী চিকিৎসক দাবি করলেও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই। উল্টো অনুমোদনহীন একটি ‘ম্যাজিক মেশিন’ রোগীর শরীরে ঠেকিয়ে ‘আলাদীনের চেরাগের’ মতো মুহূর্তেই সব রোগ বলে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছেন তিনি।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবায় ভুয়া ডাক্তারের এই চেম্বারে সরেজমিনে গিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর প্রতারণার চিত্র দেখা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জাজিরার নাওডোবার আলম ব্যাপারীর প্রজেক্টের ভেতরে একটি আবাসিক এলাকার বাসা ভাড়া নিয়ে এই জালিয়াতি চালাচ্ছেন মাসুদ। বাসার একপাশে করা হয়েছে রোগী দেখার চেম্বার এবং অন্যপাশে গড়ে তোলা হয়েছে ফার্মেসি। এর আগে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার মুন্সিরহাট এলাকায় প্রথম চেম্বার খোলেন তিনি। সেখানে অনুমোদনহীন মেশিন দিয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণার অভিযোগে প্রশাসন তাকে জরিমানা করে এবং তার মেশিন জব্দ করে। এরপর শিবচর থেকে পালিয়ে জাজিরায় এসে আবারও একই পন্থায় প্রতারণা শুরু করেন।
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভুয়া ডাক্তার মাসুদ রানাকে দেখাতে অসংখ্য ভুক্তভোগী রোগী ৫০০ টাকা করে ভিজিট দিয়ে টোকেন হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে চেম্বারে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই বদলে যায় ভেতরের চিত্র। রোগীদের রেখেই তড়িঘড়ি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মাসুদ রানা।
একপর্যায়ে কৌশলে চেম্বার থেকে বের করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ক্যামেরার সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন তিনি। মাসুদ রানা জানান, চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক শিক্ষা তার নেই। তিনি পড়াশোনা করেছেন জেনারেল লাইনে। তবে তার বাবা পল্লী চিকিৎসক হওয়ায়, বাবার কাছ থেকে মূলত ওষুধের নাম ও পরিচয় হাতে-কলমে শিখেছেন। আর সেই যৎসামান্য ধারণাকে পুঁজি করেই বছরের পর বছর ধরে মানুষের জীবন নিয়ে এই বিপজ্জনক খেলা খেলছেন তিনি।
নাওডোবার আলম ব্যাপারীর প্রজেক্ট এলাকার বাসিন্দা রিনা বেগম (৫০) মাঝে মধ্যে অসুস্থ হলে চিকিৎসা সেবা নিতে কথিত ডাক্তার মাসুদ রানার কাছে আসতেন। এসময় মাসুদ রানা তাকে পরিক্ষা-নিরিক্ষা করে ঔষধ পত্র লিখে দিতেন। তিনি জানতেন না এই মাসুদ রানা একজন প্রতারক। এবিষয়ে রিনা বেগম বলেন, আমি মাঝে মধ্যেই চিকিৎসা নিতে আসতাম এখানে। আমি অশিক্ষিত মানুষ লেখাপড়া জানিনা বাবা। ডাক্তার আসল না নকল এগুলো আমরা কি ভাবে জানবো। এই ডাক্তারের ঔষধ খেয়ে সহজে রুগী সুস্থ হতো না তাও কষ্ট করে অপেক্ষা করতাম। আমাদের এই প্রজেক্ট থেকে সরকারি হাসপাতাল অনেকদূর তাই এখানেই মানুষ চিকিৎসা নিতে আসতো। আজ আপনারা আসাতে জানলাম তিনি একজন ভূয়া এবং লাইসেন্স ছাড়াই ডাক্তারি করছেন। আমরা এই ভূয়া ডাক্তারের বিচার চাই পাশাপাশি এইধরনের ডাক্তার আমাদের এলাকায় যেনো না আসতে পারে সেদিকে খেয়াল রাইখেন আপনারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল ব্যাপারী বলেন, “আমাদের প্রজেক্টে বসে একজন ডাক্তার রোগী দেখেন, এমনটা আমি আগে শুনেছিলাম। তবে আমার জানা মতে, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই। তাই আমার পরিচিত কেউ সামনে পড়লে আমি নিজেই তাদেরকে এই নামধারী ভুয়া ডাক্তারের কাছে যেতে নিষেধ করি।”
প্রতারণার শিকার হওয়া প্রজেক্টের স্থানীয় বাসিন্দা পলি আক্তার জানান, “এই ভুয়া ডাক্তার শুরুতে প্রজেক্টের ভেতরে আমাদের বাসার পাশেই একটা বাসা ভাড়া নিয়েছিল। সেখানে সে চিকিৎসার নামে মানুষের সাথে চরম প্রতারণা শুরু করে। পরবর্তীতে আমরা স্থানীয়রা একজোট হয়ে তাকে ওই এলাকা থেকে বের করে দেই। পরে শুনেছি, সে প্রজেক্টের একদম শেষ মাথায় অন্য একটা বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে আবারও এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের উচিত এই প্রতারকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।”
এবিষয়ে অভিযুক্ত কথিত ডাক্তার মাসুদ রানা বলেন, আমি পড়াশোনা করেছি জেনারেল লাইনে। আমার বাবা পল্লী চিকিৎসক হওয়ায় আমি বাবার কাছ থেকে ওষুধের নাম ও পরিচয় হাতে-কলমে শিখেছি। আমি নিজেও একজন পল্লী চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। নিষিদ্ধ ‘ম্যাজিক মেশিন’ দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া ও সাটিফিকেট আছে কি না এবিষয় জানতে চাইলে তিনি কথা না বলে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) রোমান বাদশা বলেন, “প্রথমত, একজন পল্লী চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, মাসুদ রোগ নির্ণয়ের জন্য যে ধরনের ডিভাইস বা মেশিন ব্যবহার করছেন, বাংলাদেশে সেটির কোনো অনুমোদন নেই।” সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এই ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।






