ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে পাকিস্তান। এ লক্ষ্যে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরান সফর করেছেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জন্য একটি ‘বিশেষ চিঠি’ নিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এমন এক সময়ে এই সফর হচ্ছে, যখন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চললেও সমঝোতা এখনও অধরাই রয়ে গেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনাও ক্রমেই বাড়ছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, শনিবার (৬ জুন) রাতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে নাকভি জানান, বৈঠকে সর্বশেষ আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অবশ্য তেহরানে পৌঁছানোর আগে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছিল, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী মোজতবা খামেনির উদ্দেশে যে চিঠি পাঠিয়েছেন, সেটিই সেখানে নিয়ে গেছেন নাকভি।
মূলত নাকভির এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। রোববার (৭ জুন) মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ইরানের দুটি হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী।
এর আগে গত শুক্রবার সেন্টকম দাবি করে, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ছোড়া সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালির দিকে পাঠানো চারটি ইরানি ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছিল। মার্কিন বাহিনী আরও জানায়, পরবর্তী সময়ে তারা গারুক এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলা চালায়।
পাল্টাপাল্টি এসব হামলাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে এবং এর প্রভাবও সবচেয়ে বেশি তাদের ওপরই পড়েছে। বাহরাইন সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর রয়েছে।
কুয়েত বলেছে, এসব হামলা ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ সৃষ্টি করেছে। মিশর, জর্ডান এবং কাতারও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। অবশ্য পাল্টাপাল্টি হামলা ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চললেও যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনও কোনও সমঝোতা হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনও কখনও নতুন সামরিক অভিযানের হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনও তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তি ও কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদও প্রকাশ করছেন। গত সপ্তাহের বুধবার তিনি বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহেই একটি চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।
তবে ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সতর্কতার সুর শোনা যাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘আলোচনা বর্তমানে অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে এবং এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে ট্রাম্পকেই।’
তিনি একই সঙ্গে ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করার আহ্বান জানান।
আল জাজিরা বলছে, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করা চলমান আলোচনার অন্যতম প্রধান জটিল বিষয়। বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে এই অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বিভিন্ন সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ‘ভবিষ্যতে ইরানের কারণে যে কোনও ক্ষয়ক্ষতির মেরামত ও পুনর্গঠন কাজে সহায়তার জন্য আমাদের উপসাগরীয় মিত্রদের কাছে ইরানি সম্পদ ব্যবহারের সব ধরনের উপায় বিবেচনা করা হবে।’
এছাড়া আলোচনার অন্য বড় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করা, অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, মার্কিন বন্দর অবরোধ তুলে নেয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এছাড়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।
আগ্রাসনের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া এই সমুদ্রপথ ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার হুমকিও দেয়। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ফলে তেল ও গ্যাসের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে আসে। তবে ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে হওয়া সরাসরি আলোচনায় কোনও সমঝোতা হয়নি। এরপর থেকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একাধিক প্রস্তাব বিনিময় করলেও চূড়ান্ত কোনও সমাধান এখনও হয়নি।






