‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে কৃষক, নারী, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য। সরকার দেশের ২০ কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রাণ হলো কৃষকেরা। বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই কৃষকদের কথা বিবেচনা করেছে। তিনি বলেন, লবণচাষিদের জন্য একটা মূল্য নির্ধারণ করব, যাতে চাষিরা লাভবান হবেন।
এদিকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন করা হয়নি। বিএনপি সরকার যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সড়কের উন্নয়ন সেভাবেই রয়ে গেছে।
গতকাল শনিবার কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল মাঠের জনসভা এবং সদরের পিএমখালী এলাকায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক পাতলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনকালে পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেলা ১১টার দিকে নিজ হাতে মাটি কেটে খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান।
বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেট দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। বরং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কর বাড়ানো হয়েছে শুধু মদ ও সিগারেটের ওপর। কারণ, এগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু বিরোধী দল সেটি নিয়েও সমালোচনা করছে। তাদের উদ্দেশ্য জনগণ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে দেশের জন্য কাজ করব—এমন প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম। আজ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। পাতলী খাল পুনঃখনন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। খালটি পুনঃখনন হলে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং বছরে প্রায় ১২ হাজার টন কৃষি উৎপাদন বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সদ্যঘোষিত জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় ৮-১০ হাজার কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এসব কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের নগদ আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং তাদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নারী শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। আমরা সেই ধারাবাহিকতায় স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নিয়েছি। নারী শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরাও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে সহজে স্বাস্থ্যসেবা পায়, সেজন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, পাতলী খালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি। ১৯৭৭ সালে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী যে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন তিনি, পাতলী খাল ছিল তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জিয়াউর রহমান কক্সবাজারে এসে এই খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তারই ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই খালের পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন।
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ। এতে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল।
দিনব্যাপী এই সফরে প্রধানমন্ত্রী ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, পেকুয়া পৌরসভা ও মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, চকরিয়া বাস টার্মিনাল মাঠে জনসভা এবং কক্সবাজার শহরে সুধী সমাবেশসহ একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে কক্সবাজার সদরের পাতলী, চকরিয়া ও পেকুয়ায় আয়োজিত কর্মসূচিগুলোতে অংশ নেন। ওই গাড়িতে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহধর্মিণী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমেদ।
বিকাল পাঁচটার দিকে প্রধানমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পেকুয়ার বাড়িতে দুপুরের খাবার খান। এর আগে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে তিনি দেশের দ্বিতীয় জুলাই শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেন। পরে তিনি ওয়াসিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অনুদান দেন। এই সফরে অন্তত সাত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নানা কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
বার্তা বাজার/এস এইচ






