চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে তা হয়তো জ্যোতিষীও নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। তবে জুয়াড়িরা যদি বাজি ধরেন যে কোন দেশের সমর্থকরা স্টেডিয়াম সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাখবেন, তবে চোখ বন্ধ করে জাপানের ওপর বাজি ধরা যায়। প্রতিটা বিশ্বকাপেই ম্যাচ শেষে গ্যালারির আবর্জনা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে স্টেডিয়াম একদম চকচকে করে তবেই বাড়ি ফেরেন জাপানি সমর্থকরা।
জাপানে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে—”একটি পাখি যখন উড়ে যায়, সে পেছনে কোনো দাগ বা চিহ্ন রেখে যায় না।” অর্থাৎ, আপনি যেখানেই যান না কেন, স্থানটি এমনভাবে ছেড়ে আসুন যেন মনে হয় সেখানে কেউ ছিলই না। এই সামাজিক দর্শনই জাপানিদের রক্তে মিশে আছে।
শুরুটা হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে
ইন্টারকালচারাল লিডারশিপ বিশেষজ্ঞ নোজোমি মরগান সিএনএন-কে জানান, জাপানের এই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস কোনো চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির অংশ। জাপানের প্রতিটি শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই প্রতিদিন ক্লাসরুম ও বাথরুম পরিষ্কার করতে হয়।
মরগান বলেন, “প্রতিটি শিশুর ব্যাগে একটি করে ‘জোকিন’ (রিসাইকেল করা কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি ঘর মোছার ন্যাকড়া) থাকে। প্রতিদিন ক্লাসের শেষে শিক্ষকের সাথে মিলে সব টেবিল-চেয়ার সরিয়ে শিশুরা পুরো ঘর ঝাড়ু দেয় এবং মেঝে মোছে। এটা তাদের কাছে কোনো শাস্তি বা কষ্টের কাজ নয়, বরং সবাই মিলে একসঙ্গে আনন্দ করার একটি মাধ্যম।” এই শিক্ষাই বড় হয়ে তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
“টিকিট কেটেছি বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারি না”
২০০৮ সাল থেকে প্রতিটি অলিম্পিক এবং বিশ্বকাপে জাপানের ম্যাচ দেখতে যাওয়া হিরোকাজু তুনোদা এখন এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অঘোষিত মুখপাত্র। অথচ ছোটবেলায় স্কুলের এই ঝাড়ু দেওয়ার কাজটিকে তীব্র ঘৃণা করতেন তিনি!
তুনোদা সিএনএন-কে বলেন, “প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যখন মেয়ের স্কুলের ময়লা পরিষ্কার করতে গেলাম, তখন এর আসল গুরুত্ব বুঝলাম। স্টেডিয়াম কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, এটি আমাদের কাছে একটি ‘পবিত্র স্থান’। টিকিট কেটেছি বলেই আমি যেখানে সেখানে ময়লা ফেলতে পারি না। অন্যের ফেলে যাওয়া অর্ধেক খাওয়া খাবার বা কোল্ড ড্রিঙ্কসের ক্যান হাতে নেওয়া মোটেও আনন্দের কাজ নয়। তবে একবার এই অভিজ্ঞতা হলে মানুষ নিজে কখনো আবর্জনা ছড়াবে না।”
শুধু গ্যালারির সমর্থকরাই নন, জাপানের মূল ফুটবল দলও এই সংস্কৃতি মেনে চলে। ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপের মতো এবারও ম্যাচ জেতার পর বা হারার পর জাপানি ফুটবলাররা ড্রেসিংরুম একদম নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে টেবিলের ওপর একটি ‘ধন্যবাদ’ চিঠি এবং ঐতিহ্যবাহী কাগজের তৈরি ওরিগামি ক্রেন (অরিগামি পাখি) রেখে আসেন।
মাঠে তৈরি হচ্ছে ‘গ্লোবাল ভলান্টিয়ার’
সমালোচকরা অনেক সময় বলেন, জাপানিরা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করলে সেখানকার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে। তবে তুনোদা এই যুক্তি নাকচ করে বলেন, “দিনশেষে স্টেডিয়াম পরিষ্কার হচ্ছে, কেউ হারছে না এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা আগে আগে বাড়ি ফিরতে পারছেন। কাতার বিশ্বকাপে আমাদের এই কাজ দেখে ফিফা প্রশংসা করেছিল এবং প্রায় ৫০০ ভলান্টিয়ার আমাদের ধন্যবাদ জানাতে এসেছিলেন।”
এবার চলতি বিশ্বকাপে জাপানিদের আনা অতিরিক্ত নীল রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগ দেখে অন্যান্য দেশের সমর্থকরাও গ্যালারি পরিষ্কারে হাত বাড়াচ্ছেন। তুনোদা এবার মেক্সিকো ও আমেরিকার প্রবাসীদের দেওয়া ফান্ড বা অর্থায়নের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ভয়াবহ ‘নোটো উপদ্বীপ’ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একদল শিশুকে ডালাসে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের ম্যাচটি দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছেন, যেন তারা এই ট্র্যাজেডি ভুলে একটি ইতিবাচক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
জাপানিদের এই নিঃস্বার্থ পরিচ্ছন্নতা অভিযান প্রমাণ করে যে, ফুটবল কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, এটি বিশ্বকে আরও সুন্দর ও মানবিক করে তোলার একটি বৈশ্বিক মঞ্চও বটে।
বার্তা বাজার/এস এইচ






