সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর দুই বছর পার হওয়ার আগেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন লেবার পার্টির নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার। তার এই বিদায়ের পেছনে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে তার নীতি এবং ইসরাইলকে যুক্তরাজ্যের দেওয়া সমর্থন অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, গাজা ইস্যুতে ভোটারদের একাংশ লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাবেক লেবার ভোটারদের একটি বড় অংশই পরের নির্বাচনে মধ্যপন্থি বা বামপন্থি দলগুলোকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এর পেছনে তারা গাজায় ইসরাইলের অভিযান ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতাকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন এই বিষয়ে বর্তমান নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। করবিন বলেন, স্ট্যারমার করপোরেট দাতাদের স্বার্থে রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন এবং তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হলো গণহত্যায় অংশীদারত্ব ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিও সরকারের এই নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বিরোধী দলে থাকাকালীন অবস্থান
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। এর পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় গাজায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ এবং তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় স্টারমার তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকারের সুরেই ইসরাইলের এই গাজা অভিযানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ওই বছরের ১১ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে গাজায় বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো অবরোধকে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। যদিও পরে ২০ অক্টোবর তিনি এই মন্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘যৌথ শাস্তি’ বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব আনা হলে, স্টারমার লেবার এমপিদের সেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের শুরুতে তিনি কমন্স সভার স্পিকারকে প্রভাবিত করে এসএনপির একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহযোগিতা
ক্ষমতায় আসার পর স্টারমার সরকার ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রাখে। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে গাজার ওপর দিয়ে অন্তত ৫১৮টি ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিমান উড়েছে।
সরকার দাবি করেছে, এগুলো শুধু জিম্মিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য ছিল। তবে এই অভিযানগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। এমন দিনগুলোতেও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হয়েছে, যেদিন ইসরাইলি হামলায় ব্রিটিশ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ১ এপ্রিল গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের কনভয়ে ইসরাইলি হামলায় সাবেক রয়্যাল মেরিন জেমস হেন্ডারসনসহ সাতজন সাহায্যকর্মী নিহত হন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে ওই দিনের ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার ব্রিটিশ-ইসরাইলি দ্বৈত নাগরিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে গাজায় যুদ্ধ করেছেন, যাকে স্টারমার সরকার তাদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
অবশ্য কনজারভেটিভদের নীতি থেকে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনও এনেছিল লেবার সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এক্তিয়ার নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তি প্রত্যাহার করা এবং ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।
২০২৬ সালের জুনে প্রথমবারের মতো অবৈধ বসতি স্থাপনের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা না রাখার ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্য। ফ্রান্স, নরওয়ে ও কানাডার মতো দেশের সঙ্গে মিলে তারা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের অর্থায়ন করা নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে বসতি এলাকার পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্য ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ৩০টি লাইসেন্স স্থগিত করে। তবে বৈশ্বিক এফ-৩৫ ফাইটার জেটের যন্ত্রাংশ সরবরাহের খাতটিকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ রাখা হয়। এ ছাড়া স্টারমার সরকারের আমলে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো যুদ্ধাস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ
স্টারমারের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছেন তারই সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওয়েস স্ট্রিটিং।
এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং জানান, গাজা থেকে ফিরে আসা ব্রিটিশ চিকিৎসকদের দেওয়া যুদ্ধাপরাধের একটি প্রমাণসংক্রান্ত নথি তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান, তখন স্টারমার উল্টো তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি ফাঁসের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। স্টারমার বরাবরই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছেন।
পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে বিতর্ক
পররাষ্ট্র নীতিতে স্টারমার বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেও বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পরে সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে ইসরাইল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়।
চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মার্কিন নীতি অনুসরণ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে স্টারমার ঘোষণা দেন যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেবে না এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে পরে তিনি এই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন, যা আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে একটি অবৈধ যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গাজা যুদ্ধের সমালোচকদের দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামক একটি অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। উচ্চ আদালত প্রথমে এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বললেও, পরবর্তীতে আপিল বিভাগ সরকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। এই গোষ্ঠীর সমর্থনে নীরব সমাবেশ করার অপরাধেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ইসরাইলের সমালোচনা করার কারণে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেঙ্ক উইগার এবং হাসান পিকারকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ একই সময়ে ইসরাইলি সামরিক প্রধান হার্জি হালেভি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদোন সার এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যুক্তরাজ্য সফর করেছেন এবং হালেভিকে বিশেষ কূটনৈতিক সুরক্ষাও দেওয়া হয়েছিল।
মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ান্সের পরিচালক রোহান টালবট মন্তব্য করেছেন, ইসরাইলের নৃশংসতার মুখে স্ট্যারমারের আন্তর্জাতিক ভূমিকা চিরকাল অর্ধেক ব্যবস্থা এবং নিষ্ক্রিয়তার জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। গাজা ইস্যুতে সব পক্ষকেই অসন্তুষ্ট করে বিদায় নিতে হলো স্ট্যারমারকে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
বার্তা বাজার/এস এইচ






