জোরপূর্বক দোকান দখল, জুলাই শহীদের পিতাকে হেনস্তা ও প্রাণনাশের হুমকি, বাড়ি দখলচেষ্টা, অবৈধভাবে বালু বিক্রি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে তালা দিয়ে সাড়ে নয় লাখ টাকা দাবি, ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর এবং চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের পর আবারও আলোচনায় এসেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজা। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সঙ্গে আসা ধামরাই উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ চৌধুরী দুই নারী শিক্ষার্থীর গোপনে ছবি তোলা এবং তার কাছ থেকে দুটি বিয়ারের ক্যান উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার নাম।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে লিখিত স্বীকারোক্তি, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতে আর কখনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার মুচলেকা নিয়ে দেবাশীষ চৌধুরীকে ছেড়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আটক দেবাশীষ চৌধুরী ঢাকার ধামরাই উপজেলার বাসিন্দা। তিনি ধামরাই উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বাইশাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। ঘটনার সময় তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজার সঙ্গে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, বটতলা এলাকায় অবস্থানকালে দেবাশীষ চৌধুরী দুই নারী শিক্ষার্থীর অজান্তে তাদের ছবি তোলেন। বিষয়টি টের পেয়ে শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যান। সেখানে তার কাছ থেকে দুটি বিয়ারের ক্যান উদ্ধার করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে সেগুলো ধ্বংস করা হয়।
নিরাপত্তা অফিসে দেওয়া লিখিত স্বীকারোক্তিতে দেবাশীষ চৌধুরী বলেন, “আমি বটতলায় খাওয়াদাওয়া করেছি। পরে কিছু মেয়ের গোপনে ছবি তুলেছি। এটি আমার ঠিক হয়নি। আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। ভবিষ্যতে আর কখনও অনুমতি ছাড়া কারও ছবি তুলব না এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও আসব না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। অভিযোগের পর তাকে নিরাপত্তা অফিসে আনা হয়। তিনি লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না বলে মুচলেকা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত গাড়িও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে না। এসব শর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
উল্লেখ্য, গত কয়েকেমাস যাবৎ বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টা, চুরিসহ বেশ কিছু অপরাধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে বেশ জোর দিয়েছে প্রশাসন। এমতাবস্থায় নিজের প্রভাব খাটিয়ে মাদকসহ একজন ব্যক্তিকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্ণিত করেছেন সেলিম রেজা বলে দাবি করছেন অনেকেই।
এদিকে, এটি প্রথমবার নয় যে সেলিম রেজাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ৩ মে সাবেক ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে একটি দোকান দখল, জুলাই আন্দোলনের এক শহীদের পিতাকে হেনস্তা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ ওঠার পর তাকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে একে একে তার বিরুদ্ধে বাড়ি দখলচেষ্টা, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধভাবে বালু বিক্রি, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে চাঁদা দাবির অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগের ভুক্তভোগীদের মধ্যে সাধারণ মানুষ যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন নিজ দলের নেতাকর্মীরাও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চলাচলকারী ইলেকট্রিক কার্ট মালিক ইমন হাসান অভিযোগ করেন, ঋণসংক্রান্ত বিরোধের সুযোগ নিয়ে সেলিম রেজা নিজেকে ঋণদাতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তার কাছে অর্থ দাবি করেন। পরে কয়েকটি কার্ট আটকে রেখে তাকে ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়। তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সেই দাবি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। এ সময় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর, হুমকি এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও ওঠে সেলিম রেজার অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ইলেকট্রিক কার্ট মালিকের সঙ্গে সেলিম রেজার কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডও সামনে আসে। ওই অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “তুমি টাকা না দেওয়া পর্যন্ত গাড়ি আমার হেফাজতে থাকবে।”
সেসময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয় সেলিমকে।
সর্বশেষ ঘটনায় ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেলিম রেজার সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সারা দেননি। তবে, তিনি এ বিষয়ে অন্য গণমাধ্যমে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”
এ বিষয়ে দলীয় অবস্থান জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মো. বাবর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক পরিবহন ও নারী শিক্ষার্থীদের ছবি তোলা দুঃখজনক। এ ঘটনায় সেলিম রেজার কতটুকু সম্পৃক্ততা আছে সে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।
উল্লেখ্য, সেলিম রেজা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত গালিব ইমতিয়াজ নাহিদের ছত্রছায়ায় এসব করেন বলে জানা যায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি নাহিদ তিনটি বিদেশি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ যৌথ বাহিনীর অভিযানে আটক হন।
বার্তা বাজার/এস এইচ






