রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আবাসিক হলগুলোতে সিট বণ্টনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, বিশেষ কোটার ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছাত্রসংগঠনগুলো হল দখল ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করছেন পরস্পরের বিরুদ্ধে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, নীতিমালা মেনে শিক্ষার্থীদের আবাসিকতা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। বিপরীতে ১৭টি আবাসিক হলে আসনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পান, যা শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক নীতিমালা অনুযায়ী, মেধাবী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মোট আসনের ১০ শতাংশ বিশেষ কোটায় সংরক্ষিত থাকে। হল প্রাধ্যক্ষদের বিবেচনায় এই কোটা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর ব্যবহার নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১ মার্চ ছাত্রদল নেতা আমির হামজা এবং ৫ এপ্রিল আসিফ উদ্দিন নামে দুই শিক্ষার্থীকে সৈয়দ আমীর আলী হলে বিশেষ কোটায় আবাসিকতা দেওয়া হয়। তারা দুজনই রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রার্থী ছিলেন। এছাড়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে বৈধ আবাসিকতা ছাড়াই কয়েকজন শিক্ষার্থীর অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে, যাদের ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধেও হলের বিভিন্ন ব্লকে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগ হল ছাড়ার পর সেসব ব্লকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষেও শিবির-সংশ্লিষ্টদের থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটি।
এরই মধ্যে হল সিট বণ্টনে ছত্রদলের অনিয়ম ও দখলদারিত্বের অভিযোগের প্রতিবাদে কয়েকদিন আগে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। মানববন্ধন থেকে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা দাবি করেন, স্বচ্ছ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় সিট বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আবাসিকতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে ক্রিয়াশীল সংগঠন বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ এর মুখপাত্র ফুয়াদ রাতুল বলেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা স্বচ্ছ সিট বণ্টনের প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় অ্যালটমেন্ট আটকে রেখে দলীয় বিবেচনায় সিট দেওয়া হচ্ছে। কিছু হলে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের রাজনৈতিক কক্ষও গড়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, অতীতে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সিট বণ্টনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার পুনরাবৃত্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সিট বাণিজ্য, হল দখলের রাজনীতি পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রতিহত করবো।
অভিযোগের বিষয়ে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, আমাদের যেসব নেতাকর্মী হলে অবস্থান করছেন তারা সবাই নিয়মনীতি, ফলাফল ও সিনিয়রিটির ভিত্তিতে বৈধভাবে সিট পেয়েছেন। মেধার ভিত্তিতে সিট পাওয়া শিক্ষার্থীদের অবৈধ বলা ঠিক নয়।
অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশের আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রমাণ মিললে তারা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। একইসঙ্গে প্রশাসন চাইলে হল তল্লাশি চালিয়ে প্রকৃত অবৈধ অবস্থানকারীদের চিহ্নিত করতে পারে।
এদিকে সিট দখলের অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। শীঘ্রই আমরা বিভিন্ন হলে শিবিরের কারা অবৈধভাবে হলে যারা অবস্থান করছেন তাদের নাম তুলে ধরবো।
হলে সিট দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক শাহ হোসাইন আহমেদ মাহদী বলেন, উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সিট দখলের অভিযোগ তুলছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও নিয়ম অনুযায়ী সিট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের অজান্তে কেউ হলে অবস্থান করলে তা জানা সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের কোনো তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, হল প্রাধ্যক্ষরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিট বরাদ্দ দিচ্ছেন। সিট বণ্টনের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে। যারা নিয়ম না মেনে বা অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছেন, তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।






