ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে তিতাস নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজ শুরু হওয়ার প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। দীর্ঘসূত্রতায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পারাপার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কৃষ্ণনগর গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি চালু হলে কৃষ্ণনগর, ভবানীপুর, বনগজ, বরিশলসহ ৫ থেকে ৬টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন যাতায়াত সহজ হবে। তাই দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আখাউড়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, সরকারি অর্থায়নে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ২০৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৬ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কৃষ্ণনগর ও বরিশল গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নির্মিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ কোটি ২ লাখ টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আরও তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি এখনও অসমাপ্ত।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর মাঝখানে প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ একটি স্প্যান এখনও বসানো হয়নি। দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজও বাকি রয়েছে। এছাড়া সেতুর ওপরের বিভিন্ন কাজ অসম্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক বছর ধরে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, “আমাদের গ্রামে প্রায় এক হাজার মানুষের বসবাস। সেতু না থাকায় উপজেলা সদরে যেতে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সামাজিক নানা সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয়। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।”
স্কুলছাত্রী ফাহমিদা সুলতানা বলেন, “প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে ভয় নিয়ে চলাচল করতে হয়। সেতু হলে আমাদের যাতায়াত অনেক নিরাপদ হবে।”
স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে অনেক সময় নদী পার হওয়াও সম্ভব হয় না।
রুক্কু মিয়া নামে এক বৃদ্ধ বলেন, “পানির ভয়েই অনেক শিশু স্কুলে যেতে চায় না। গ্রামের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ সেতুটি দেখার অপেক্ষায় থেকেও মারা গেছেন।”
আহমেদ হোসেন বলেন, “সন্ধ্যা ৭টার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবছরই নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনাও ঘটে।”
বরিশল গ্রামের কৃষক মো. কাউছার মিয়া বলেন, “সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ ও সময় লাগে। ধান কাটার মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়। ঠিকাদারের অবহেলার কারণেই কাজ এত দেরি হচ্ছে।”
কৃষ্ণনগরের ওসমান শেখ বলেন, “আমাদের গ্রামে কোনো স্কুল নেই। শিশুদের নদী পার হয়ে অন্য গ্রামে পড়তে যেতে হয়। সেতু হলে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের যোগাযোগ সহজ হবে।”
এ বিষয়ে ঠিকাদার মো. খাইরুল হাসান বলেন, “ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে খুব শিগগিরই কাজ পুনরায় শুরু করা হবে।”
আখাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম সুমন জানান, ঠিকাদারের লোকবল ও নির্মাণসামগ্রীর সংকটের কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে।প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি বিস্তারিত জেনে ঠিকাদারের সঙ্গে বসব। দ্রুত কাজ শেষ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঠিকাদার কাজ করতে ব্যর্থ হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”






