ভারতের নয়াদিল্লীতে গতকাল ৫ আগস্ট ফরেন করেসপনডেন্ট ক্লাব-সাউথ এশিয়া আয়োজিত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান। এর পরেরদিন বৃহস্পতিবার এই ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন। হঠাৎই তদন্ত কাজে গতি আসে। দ্রুতই তদন্ত শেষ করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মকর্তারা।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, শেয়ার কারসাজি করে প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত সম্পন্ন করে যথাসময়ে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কমিশন প্রতিবেদনটি যাচাই করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগের অনুসন্ধানও চলছে।
বর্তমানে কমিশন না থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চার্জশিট অনুমোদনের সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন না। নতুন কমিশন যোগ দেওয়ার পর তা জমা দেওয়া হবে। পরে কমিশন প্রতিবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আদালতে চার্জশিট দেওয়ার অনুমোদন অথবা অভিযোগের কোনো একটি বিষয় পুনঃতদন্তের নির্দেশনা দিতে পারেন। পুরো প্রতিবেদনের সঙ্গে কমিশন একমত না হলে প্রতিবেদনটি বাতিলও করতে পারেন। অর্থাৎ দুদক আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
জানা গেছে, নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর ওইদিন রাতেই মাগুরায় সাকিব আল হাসানের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। এর পরদিনই তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তে নতুন গতি আসে।
শেয়ার কারসাজি করে প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৭ জুন মামলা করেছিল দুদক। এই মামলাটিই তদন্ত করা হচ্ছে।
দুদক জানায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্রুত সময়ে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার অভিপ্রায়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রচলিত আইন ও বিধি (সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ এর ১৭ ধারা) পরিকল্পিতভাবে লঙ্ঘন করেছেন। তারা নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিও একাউন্টসসমূহে অবৈধ উপায়ে ফটকা ব্যবসার মতো সিরিজ লেনদেন, প্রতারণামূলক ট্রেডিং, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বাজারকে প্রভাবিত করেছেন।
দুদক আরও জানায়, পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ার সংঘবদ্ধভাবে ক্রমাগত ক্রয়-বিক্রয় করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওই শেয়ারসমূহে বিনিয়োগে প্রতারণামূলকভাবে প্রলুব্ধ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে তাদের কাছ থেকে মোট ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। আসামিরা অস্বাভাবিক রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইনের নামে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থ শেয়ারবাজার থেকে সংঘবদ্ধভাবে উত্তোলন করেন।
আসামি মো. আবুল খায়ের ওরফে হিরু কর্তৃক তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সহায়তায় ক্যাপিটাল গেইনের নামে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থের ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার টাকার উৎস গোপনের অভিপ্রায়ে লেয়ারিং করে বিভিন্ন খাতে স্থানান্তর করেন। আবুল খায়েরের ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার টাকার অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক এবং সন্দেহজনক প্রকৃতির লেনদেন করা হয়।
আসামি আবুল খায়ের কর্তৃক শেয়ার বাজারে কারসাজিকৃত প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং সোনালী পেপারসের শেয়ারে সাকিব আল হাসান বিনিয়োগ করে ম্যানিপুলেশন করেছেন। তিনি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কারসাজিকৃত শেয়ারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে তাদের ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইনের নামে অপরাধলব্ধ আয় হিসেবে শেয়ার বাজার থেকে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক মো. আবুল খায়ের (হিরু), আবুল খায়েরের স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, খিলগাঁওয়ের আবুল কালাম মাদবর, আবুল কালাম মাদবরের মেয়ে কনিকা আফরোজ, ছেলে মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর, শরীয়তপুরের নড়িয়ার আলেয়া বেগম, কাজি ফুয়াদ হাসান, কাজি ফরিদ হাসান, মাগুরা পৌরসভার শিরিন আক্তার, ঢাকার গুলশানের জাভেদ এ মতিন, চাঁদপুরের মিরপুর উপজেলার মো. জাহেদ কামাল, যশোরের শার্শা উপজেলার মো. হুমায়ূন কবির ও ঢাকার কেরাণীগঞ্জের তানভীর নিজাম।
আসামিরা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/১২০বি/১০৯ ধারায় শান্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।






