তীব্র যানজট, হর্নের বিকট শব্দ আর দীর্ঘ ভোগান্তি—ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের নিত্যদিনের চিত্র যেন এমনই। শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকছে। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের ভাষ্য, শহরজুড়ে প্রায় ২০ হাজার ইজিবাইক চলাচল করছে। এর অধিকাংশেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগের বিরুদ্ধে ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ট্রাফিক বিভাগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, শহরে অবৈধ ইজিবাইকের এমন দাপটের জন্য দায়ী কে—পৌরসভা, ট্রাফিক বিভাগ নাকি প্রশাসন?
‘মাসোহারা’ দিয়ে চলে ইজিবাইক
স্থানীয় অটোরিকশা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশকে নিয়মিত টাকা দিয়ে অনেক ইজিবাইক শহরে চলাচল করছে। এক বা দুটি গাড়ির মালিকেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলাচলের সুযোগ নেন। আর যাঁদের ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত ইজিবাইক রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অটোরিকশা ব্যবসায়ী বলেন, তাঁদের যৌথ মালিকানায় ৩০ থেকে ৪০টি ইজিবাইক রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে ট্রাফিক বিভাগকে ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়। টাকা দেওয়ার পর রাস্তায় গাড়ি চালাতে কোনো সমস্যা হয় না।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
১০০ মিটার পথ যেতে আধা ঘণ্টা
শহরের কাউতলী থেকে কুমারশীল, মেড্ডা, পৈরতলা, কালীবাড়ি মোড় ও হাসপাতাল মোড়—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সংযোগস্থলে যানজট লেগেই থাকছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র ১০০ মিটার পথ পাড়ি দিতেও কখনো কখনো ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগে।
শহরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, যানজটের কারণে গাড়িতে চলাচলের চেয়ে অনেক সময় হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শনিবার পর্যন্ত ছুটির সময় যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
চার হাজার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ
পৌরসভার প্রশাসক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালে পৌরসভা থেকে প্রায় চার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। সেসব লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নবায়ন করা হয়নি। তাঁর দাবি, শহরে চলাচলকারী অন্য গাড়িগুলো অবৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রে নকল নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শরিফুল ইসলাম বলেন, ট্রাফিক বিভাগ কোনো অবৈধ গাড়িকে শহরে প্রবেশে বাধা দিলে সেটি শহরে ঢুকতে পারবে না। ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অনেক অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার ট্রাফিক বিভাগের
তবে পৌর প্রশাসকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ট্রাফিক ইনচার্জ সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, অটোরিকশার লাইসেন্স পরীক্ষা করা, মামলা দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা ট্রাফিক পুলিশের কাজ নয়। তাঁদের কাজ যানবাহন তদারকি করা।
তিনি বলেন, পৌরসভা অভিযান পরিচালনা করলে ট্রাফিক পুলিশ সহযোগিতা করবে। পৌরসভা অভিযান না করলে এর দায়ভার ট্রাফিক পুলিশ নেবে কেন—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন।
বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন
ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ইজিবাইকের ব্যাটারি বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়ায় এর প্রভাব স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর পড়ছে বলে তাঁদের ধারণা।
তবে ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্যুৎ ঘাটতির কতটা সৃষ্টি হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের আশ্বাস, বাস্তবে অগ্রগতি নেই
বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবু সাইদ বলেন, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে। ভুয়া লাইসেন্স ও অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিয়মে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথমে বৈধ লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়া হবে। এরপর অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তবে জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যের পর এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এমপির সঙ্গে আলোচনার কথা পৌর প্রশাসকের
এ বিষয়ে জানতে পৌর প্রশাসক মো. শরিফুল ইসলামের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসবেন। তিনি আসার পর তাঁকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাটির একটি সুনির্দিষ্ট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশাসন, পৌরসভা ও ট্রাফিক বিভাগের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের যানজটের এই সংকট আরও কত দিন চলবে—এ প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের।
শহরের বাসিন্দাদের দাবি, কে দায়ী তা নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ না করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে অবৈধ ইজিবাইক শনাক্ত, বৈধ যানবাহনের তালিকা তৈরি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ঘুষ বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তাঁদের।






