‘স্লিপ স্কোর সম্পূর্ণ মনগড়া’! তাহলে ভালো ঘুমের উপায় কী?
এক্সক্লুসিভ ডেস্ক : স্লিপ স্কোর, ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট কিংবা হোয়াইট নয়েজ মেশিন—এসব দিয়ে একসময়ের অতি স্বাভাবিক ও সহজাত প্রক্রিয়া ঘুম এখন এক জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আর ফিটনেস ট্রেন্ডের যুগে ঘুমকে নিখুঁত করার এক তীব্র প্রতিযোগিতায় মেতেছে মানুষ। যাকে বলা হচ্ছে ‘স্লিপম্যাক্সিং’।
তবে ঘুমকে নিখুঁত করার এই অতিরিক্ত চেষ্টা বা মোহের পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘অর্থোসমনিয়া’ বলে। এটি মূলত পারফেক্ট ঘুম পাওয়ার একধরনের মানসিক একগুঁয়েমি।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসকরা রোগীদের মধ্যে এই স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন। অনেকেই স্মার্টওয়াচ বা স্লিপ ট্র্যাকারের ডাটা নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে ছুটে আসছেন। ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ভাবছেন, তারা গুরুতর কোনো ঘুমজনিত রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পারফেক্ট ঘুমের এই অতিরিক্ত চিন্তাই প্রকৃতপক্ষে মানুষের ঘুম নষ্ট করছে।
‘স্লিপ স্কোর সম্পূর্ণ মনগড়া’
২০০৯ সালে ফিটবিট ক্লাসিকের মাধ্যমে ট্র্যাকার দিয়ে ঘুম পরিমাপের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন অ্যাপল, গার্মিন কিংবা আউরা ও আল্ট্রাহিউম্যানের মতো স্মার্ট রিংয়ের কারণে তুঙ্গে উঠেছে। এসব ডিভাইস ব্যবহারকারীদের হালকা ঘুম, গভীর ঘুম এবং ‘রেপিড আই মুভমেন্ট’ (REM)-এর ডাটা বিশ্লেষণের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট ‘স্লিপ স্কোর’ দেয়।
তবে লন্ডনের রয়্যাল ব্রোমপ্টন হসপিটালের ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. আলানা হেয়ারের মতে, স্লিপ স্কোর ধারণাটি সম্পূর্ণ মনগড়া। তিনি বলেন, “চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘স্লিপ স্কোর’ বলে স্বীকৃত কোনো শব্দ নেই। প্রযুক্তি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক স্বার্থে এটি তৈরি করেছে।
উল্টো এই ট্র্যাকারগুলো মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করছে, যা তাদের ঘুম না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।”
সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোতে স্মার্ট রিং প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘আউরা’-র বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ তোলা হয়, এসব রিং সঠিকভাবে ঘুমের মান বা ধাপ মাপতে পারে না। এগুলো মূলত এআই-ভিত্তিক অনুমানের ওপর নির্ভর করে, যা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখার মতো (৫০-৫০)। তবে আউরা তাদের প্রযুক্তির নির্ভুলতার পক্ষে সাফাই গেয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্লিপ ট্র্যাকারগুলো মানুষের সারাদিনের মেজাজ ও কার্যক্ষমতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গবেষকরা বেশ কয়েকজন অংশ গ্রহণকারীকে এলোমেলো ও ভুয়া স্লিপ স্কোর দেন, যার সঙ্গে বাস্তব ঘুমের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পরদিন দেখা যায়, যাদের ভুয়া খারাপ স্কোর দেওয়া হয়েছিল, তারা বাস্তবে ভালো ঘুমানো সত্ত্বেও নিজেদের ক্লান্ত ও মানসিকভারাক্রান্ত মনে করছেন।
লন্ডনের এইচআর পেশাজীবী জেস হিল (৩২) জানান, গার্মিন ঘড়ি কেনার পর তিনি তিন বছর ধরে হাই স্লিপ স্কোরের আশায় বসে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ঘড়ির স্কোর খারাপ আসলে ধরে নিতাম আজ সারাদিন আমার খুব খারাপ যাবে। গত সপ্তাহে আমি রাতে টানা চার ঘণ্টা জেগে ছিলাম। অথচ সকালে ঘড়ি দেখাচ্ছে— দারুণ ঘুম হয়েছে! তখনই বুঝলাম এই প্রযুক্তিকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা ভুল।’
ঘুম বিশেষজ্ঞ ও লেখক ড. নীল স্ট্যানলি মনে করেন, ঘুমকে একটি খেলায় রূপ দেওয়ার কারণেই ঘুমের ব্যাঘাত বাড়ছে। তিনি স্পষ্ট জানান, ‘আপনি যদি সত্যিই ঘুমের সঠিক মান জানতে চান, তবে মস্তিষ্কের তরঙ্গের ওপর নজর রাখতে হবে। হাত বা আঙুলের নাড়াচাড়া মেপে কখনো আসল ঘুমের গভীরতা জানা সম্ভব নয়।’
তাহলে ভালো ঘুমের উপায় কী?
জটিল কোনো প্রযুক্তি নয়, সহজ কিছু নিয়ম মেনেই কাঙ্ক্ষিত ঘুম সম্ভব বলে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ড. আলানা হেয়ার।
পরিবেশ : শোবার ঘরটি সহনীয় মাত্রায় ঠাণ্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। তবে সবকিছু শতভাগ পারফেক্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সকালের রোদ: ঘুম থেকে উঠে সকালেই মিষ্টি রোদে খানিকটা সময় কাটান। এটি শরীরের স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক রাখে।
হালকা শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিন হালকা শারীরিক পরিশ্রম করুন এবং প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূলযুক্ত পুষ্টিকর খাবার খান।
সহজ-সরল লাইফস্টাইল: অতিরিক্ত গ্যাজেট বা জটিল কৌশল বাদ দিন। সহজ-সরল নিয়মের বাইরে বাড়তি আর কিছুরই আসলে কোনো প্রয়োজন নেই।






