অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হামলা-সংঘর্ষ হয়েছে গত কয়েক দিনে। দুই সংগঠনই এ জন্য একে অপরকে দায়ী করছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীদের মতে, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার ঘাটতি রয়েছে। আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ প্রধানত শিবিরের হাতে। এখন সেসব ছাত্রদল নিতে শুরু করেছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সর্বশেষ পরিস্থিতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদে ছাত্রশিবিরের আধিপত্য। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে এটিই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছে ছাত্রদল। পাশাপাশি তাদের অভিযোগ, নামে-বেনামে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং হলের ক্লাবগুলোতে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে অন্যদের অবস্থান সংকুচিত করে তুলেছে। শিবিবের এই ‘মোড়লিপনা’ আর মানতে নারাজ ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্র সংগঠনটি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু নির্বাচনে ভিপি, জিএস ও এজিএস এবং ১২টি সম্পাদক পদের মধ্যে ৯টিতে জয়লাভ করেন শিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা।
আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ ছিল না। ছাত্রদলও ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। হল ও ক্যাম্পাসে একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের হাতে। ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ১৭ জুলাই হলের কক্ষ ভাঙচুর করে ও নেতাদের বের করে দিয়ে হলগুলোকে ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা।
দুই সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিবিরের নেতাকর্মীদের বড় অংশই তখন ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে থাকায় হলের ভেতরেই অবস্থান ছিল। ফলে খুব সহজে সেই রাতেই হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ শিবিরের হাতে চলে যায়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে ছাত্রশিবির। প্রকাশ্যে আসার এক বছরের মাথায় ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়ে বড় জয় পায়। বিপরীতে হল ও ক্যাম্পাসে ছাত্রদল সেভাবে অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়লাভ করে শিবির সমর্থিত প্যানেল। ছাত্রদল কোনো পদে জয় পায়নি। এ ছাড়া ১৮টি হলের মোট ৫৪টি প্রধান পদের মধ্যে ছাত্রদল মাত্র একটি পদে জয়ী হতে পেরেছিল। ছাত্রলীগকে তাড়ানোর পরপরই শিবির হল ও ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় এমন ফলাফল হয় বলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মনে করেন। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও হল ও ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। হলগুলোতে এখনও ছাত্রদলের জনবল অনেক কম।
অন্যদিকে শিবির তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির কয়েকজন বাদে অন্য কোনো কমিটি বা নেতাকর্মীর নাম প্রকাশ করে না। সংগঠনটির কর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীর বেশে থাকেন। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা জানান, শিবিরের অধিকাংশের নাম-পরিচয় গোপন থাকে, আর বিপরীতে ছাত্রদলের সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ্য, ফলে কোনো ক্লাব বা কমিটিতে ছাত্রদলের কেউ যুক্ত হতে গেলে বা কোনো উদ্যোগ নিলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দোহাই দিয়ে শক্ত বিরোধিতা গড়ে তোলে।
শিবির প্রকাশ্যে বড় শোডাউন বা মিছিল-মিটিং না করলেও বিভিন্ন পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের আদর্শিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে ক্যাম্পাসে আলোচনা আছে। পাশাপাশি বড় তহবিল থাকার কারণে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনও করে সংগঠনটি।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন সমকালকে বলেন, ‘আমরা প্রায় দেড় দশক ধরে সরাসরি ছাত্রলীগের নির্যাতন ও একাধিপত্যের বিপরীতে রাজনীতি করেছি। কিন্তু শিবির তখন প্রকাশ্যে ছিল না। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবির হলগুলোতে ছদ্মবেশে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনে নিজেদের আসল রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রেখে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। তারা কোথাও সুযোগ পেলে অন্যদের স্বাভাবিক সুযোগও মানতে চায় না।’
শিবির ভিন্নমত একদম সহ্য করতে পারে না বলে অভিযোগ করেন নাহিদুজ্জামান শিপন। তিনি আরও বলেন, শিবির যদি নিজেদের সংশোধন না করে এবং ছাত্রলীগের মতো একই আচরণ ও সংঘাতের পথ পরিহার না করে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে নব্বইয়ের মতো আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিক ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। চাঁদাবাজি, হল দখল, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে রক্তাক্ত করা থেকে শুরু তাদের সামগ্রিক কার্যক্রম পেশিশক্তিনির্ভর। যেটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল।
কাজী আশিক বলেন, দুর্ভাগ্যবশত ছাত্রলীগের সব কাজ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে ছাত্রদল এই দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেব না।






