রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন ভবনে পরিকল্পিত চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্টোররুমে আগুন দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। গভীর রাতে বোরখা পরিহিত এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ভবনের দ্বিতীয় তলার অস্থায়ী স্টোররুমে অন্তত পাঁচবার প্রবেশ করে ৮৩টি ল্যাপটপ নিয়ে যায়। পরে বের হওয়ার সময় কক্ষে আগুন লাগিয়ে দ্রুত পালায়। এ ঘটনায় প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মধ্য রাত থেকে শুক্রবার (১ মে) ভোরের মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেন।
মামলার বাদী বলেন, ‘বোরখা পরিহিত ওই ব্যক্তি চুরির জন্য রুমে ঢোকেন। চুরি শেষে তিনি আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যান। মামলায় এভাবেই অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’
এছাড়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মিরপুর মডেল থানার একাধিক কর্মকর্তা। মামলার এজাহার সূত্রে তারা বলেন, শুক্রবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে দায়িত্বরত আনসার সদস্য আনোয়ারুল নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে বিষয়টি টের পান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আইয়ুব আলীকে ডাকেন।
পরে বিষয়টি অফিস সহকারী এমাম হোসেনকে জানানো হলে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। খবর পেয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্টোররুমের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।
একই সঙ্গে ভবনের পূর্ব পাশের গ্লাস ভেঙে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। কিছু সময়ের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখা যায়, কক্ষের এসি, সংরক্ষিত ল্যাপটপ ও বিভিন্ন মালামালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে থানা-পুলিশের কর্মকর্তারা দেখতে পান, রাত আনুমানিক ২টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যে বোরখা পরিহিত এক ব্যক্তি কৌশলে স্টোররুমের তালা খুলে ভেতরে ঢোকে। ফুটেজে দেখা যায়, সে মোট পাঁচবার কক্ষে প্রবেশ করে মালামাল বের করে নিয়ে যায়। শেষবার বের হওয়ার সময় কক্ষে আগুন লাগিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তাৎক্ষণিক যাচাইয়ে দেখা যায়, স্টোররুমে থাকা ৭৩৫টি ল্যাপটপের মধ্যে ৪৫০টি অক্ষত রয়েছে। ৩৩টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, ২৯টি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৪০টি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এছাড়া ৮৩টি ল্যাপটপ খোয়া গেছে। ল্যাপটপের ব্যাগসহ অন্যান্য সরঞ্জামও নষ্ট হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট এবং চুরির আলামত গোপন করতেই পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে আনুমানিক দুই থেকে তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার একটি সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। আগুন লাগানো ও চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্তে কাজ চলছে। এটি একক নাকি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত শুক্রবার সকালে সকালে অগ্নিকাণ্ডস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সেসময় তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন এবং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী উপস্থিত ছিলেন।
ধ্বংসাবশেষ দেখে মন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে সচিবকে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, এই আগুনের পেছনে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
এছাড়া তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে তাগিদ দেন।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






