একটি প্রতারণার মামলায় ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন দুই নারী। আদালত জামিন না দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর দুদিন পর বাদী পক্ষে দাবি করা হয়েছে ওই দুই নারী আসামির একজনের বদলে তার ছোট বোন কারাগারে গেছেন।
আদালত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় আসামি পক্ষের আইনজীবী নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে এ মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেছেন।
আসামি বড় বোনের পক্ষে ছোট বোনের আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যাওয়ার এ ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার। তবে বৃহস্পতিবার এ আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদী পক্ষে দাবি করা হয়, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি নন। তিনি অন্য কেউ। বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
এটি জানাজানি হয় রোববার; যখন এ মামলার চার আসামির আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব ‘আয়নাবাজি’ কাণ্ডের পর এ মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে আদালতে আবেদন করেন।
আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ‘বড় বোনের বদলে ছোট বোনের’ আত্মসমর্পণ ও কারাগারে যাওয়ার ‘আয়নাবাজির’ মত এ ঘটনা জানা গেছে। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলেন, শারমিন আক্তার একা ও লাইলী শাহনাজ খুশি নামে এ দুই আসামি মঙ্গলবার উত্তরা পূর্ব থানার প্রতারণার ওই মামলায় আত্মসমর্পণ করেন। সেদিন তাদের কারাগারে পাঠান বিচারক।
পরে একাকে জিজ্ঞাসাবাদে ১০ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে শুনানি শুরু হয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে।
শুনানিকালে একাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাদী আজিজুল আলমের বন্ধু বাদল আহম্মেদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী মামলার আসামি একা নন বলে শুনানিকালে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে জানান বাদল। এসময় বোরকা ও নেকাপ পরিহিত ছিলেন ওই আসামি।
এমন তথ্যে আদালত ওই নারীকে মুখ দেখাতে বলেন। তখন আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর। পরে ব্চিারক এই নারী আসামি শারমিন আক্তার একা কিনা তা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার বাদী আজিজুল আলম বলেন, “আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত আমি যাকে আসামি করেছি সেই একা ইনি নন। এটা তার ছোট বোন। তবে নাম জানি না। আদালতের সাথে প্রতারণা করেছে। একা না হয়ে একা সেজে কারাগারে রয়েছে।”
তার বন্ধু বাদল আহম্মেদ বলেন, “সেদিন আমি আদালতে উপস্থিত ছিলাম। ওই আসামি মুখে পর্দা দিয়ে রেখেছিল। বডির স্ট্রাকচার দেখে বুঝি সে একা না। আদালতকে জানাই। আদালত জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টের সাথে আসামির চেহারার মিল পাননি। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।”
মামলার চার আসামি শারমিন আক্তার একা, লাইলী শাহনাজ খুশি, এ আর রাসেল ও আব্বাসের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব।
এ ঘটনার পর ক্ষমা চেয়ে রোববার আদালতে করা আবেদন তিনি বলেন, “আত্মসমর্পণ করার সময় একা ও খুশি বোরকা ও নেকাপ পরিহিত থাকায় আইনজীবী হিসেবে আসামিদের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসাবাদ করে সরল বিশ্বাসে আদালতে হাজির করাই। এর আগে আসামিদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলাম না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাদী ও বাদীপক্ষের আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে পরে উপলব্ধি করতে পারি, আসামিরা আমাকে প্রতারিত করেছে।”
আদালত তার আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আতিকুর রহমান। সোমবার একার রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজু আহম্মেদ রাজিব বলেন, “এই আসামি যে একা না ঠিক পাইনি। এখন এর বেশি কিছু বলছি না।” এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটেছে। আসামি একার হয়ে একজন প্রক্সি দিয়েছিল। বাদীপক্ষ বিষয়টি আদালতকে জানায়। আদালত বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলেছেন।”
তিনি বলেন, “ওরা একটা চক্র। ওদের কাজই হলো আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটানো, এমন কাজ করা।”
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম বলেন, “একজনের হয়ে আরেকজন কারাগারে গেছে। বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ওই আসামি কারাগারে আছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব কিছু জানা যাবে। তারপর আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেব।”
মামলার পূর্বাপর
প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম, শয়তানের নি:শ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে এ মামলা চলছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চক্রটি ১৪-১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নিয়েছে। এ ঘটনায় আজিজুল আলম নামের ওই ব্যবসায়ী উত্তরা পূর্ব থানায় চক্রের ২৪ সদস্যের নামে মামলা করেন।
মামলার পর শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষারকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
আজিজুল মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান তার কাছে যায়। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। আজিজুল জানান, আছে। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনবে। যার অর্ধেক আজিজুলকে দেবে।
“সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে।
“তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।”
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, “কিছুদিন পর আবার জ্বিনের মা পরিচয়ে এক নারী তাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেয়। তারপর থেকে নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকে। বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারা তার কাছ থেকে নগদ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়।
“পরবর্তীতে জ্বীনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে নেয়।”
এছাড়া তার উত্তরখান এলাকা ১৪-১৬ কোটি টাকার ২৭ দশমিত ১৫ কাঠা জমি লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।
বার্তা বাজার/এস এইচ






