বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য উত্তেজনায় অবশেষে সাময়িক বিরতি এসেছে। সোমবার উভয় দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, যার আওতায় ৯০ দিনের জন্য শুল্ক বৃদ্ধির প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে আশার আলো জাগিয়েছে, যদিও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।
বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন অর্থনীতি গভীর চাপে ছিল। হঠাৎ করে শুল্ক আরোপ ও পাল্টা শুল্কের ফলে আমদানি-রপ্তানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে এক ধাপ পেছনে না সরে এলে অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দায় ঢুকে পড়ত।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে দোকানগুলোতে প্রয়োজনীয় পণ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং ক্রিসমাসের বাজার বিপর্যস্ত হতে পারে। বিশেষত, চীনের পণ্যে সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ ছিল অর্থনীতির ওপর একটি বিশাল বোঝা।
স্বল্পস্থায়ী স্বস্তি, কিন্তু ঝুঁকি রয়েই গেছে
যদিও ওয়াল স্ট্রিটে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে এবং বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। শুল্ক এখনো আগের চেয়ে অনেক বেশি, এবং আস্থা ও বাণিজ্যের ধারাবাহিকতায় যে ধাক্কা লেগেছে, তা সহজে কাটানো সম্ভব নয়।
মুডিজ অ্যানালিটিকস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি বলেন, বর্তমান শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও মন্দার ঝুঁকি কিছুটা কমে এখন ৪৫ শতাংশে নেমেছে, তা আগেও ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ৯০ দিনের বিরতি বড় কোনো অর্জন নয় বরং একটি 'মোচড়' মাত্র। যদি এই সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হয়, তবে আবারও আগের মত উচ্চ শুল্ক ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, চুক্তি না হলে শুল্ক "অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।"
শুল্ক যুদ্ধের ফল: ভাঙনের মুখে সরবরাহব্যবস্থা
চীনা পণ্যের ওপর এত উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ছোট ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কার্যত চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে একটি প্রকার নিষেধাজ্ঞার শামিল। মার্কিন বাজারে নির্ভরশীল খুচরা ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছিলেন, এর ফলে দোকানের তাক খালি হয়ে যেতে পারে।
ব্লিকলি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পিটার বুকভার বলেন, “ক্রিসমাসের বাজার রক্ষায় উভয় দেশই এক ধাপ পিছু হটেছে।” তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে এনেছে।
তৈরি সংকট ও অনিশ্চয়তার দোলাচল
বাণিজ্য নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক পরিবর্তন এবং কৌশলগত অস্থিরতা বাজারে স্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম বলছে, ১৯৬০ দশকের পর বাণিজ্য নীতিগত অনিশ্চয়তা এত বেশি কখনো ছিল না।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্টিন উলফার্স বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা কয়েক দিন আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও, তা এখনো ট্রাম্পের প্রথম দিনের চেয়েও খারাপ।”
অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাসের মতে, আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার আশঙ্কা এখনো ৫৫ শতাংশ। ডয়েচে ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাণিজ্যনীতিতে কিছুটা নমনীয়তা এলেও, বাজারে আস্থার অভাব রয়েই গেছে।
উপসংহার
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে সাময়িক বিরতি আনা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি কৌশলগত পিছু হটা হলেও, এটি পুরোপুরি সমাধান নয়। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে, এই অস্থিরতা যত দিন থাকবে, তত দিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে থাকবে। সামনে কী আসছে—নতুন চুক্তি নাকি আবারও দ্বন্দ্ব—তা সময়ই বলে দেবে।





