ভেনেজুয়েলার সরকার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে বিবেচিত আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া শুরু করেছে। কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে ‘সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের পাঁচজন নাগরিককে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত ভেনেজুয়েলা-স্পেনীয় মানবাধিকার কর্মী রোসিও সান মিগুয়েল।
তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র শনিবার রাজধানী কারাকাসে আকস্মিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে এবং নিউইয়র্কে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করেছে।
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান দাবি ছিল, বিশেষ করে নির্বাচন বা বিক্ষোভ ঘিরে দমন–পীড়ন বেড়ে যাওয়ার সময়গুলোতে। ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ভাই জর্জে রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দিকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দেওয়া হবে।
’ তবে তিনি কতজন বা কারা মুক্তি পাচ্ছেন, ওই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন কারাগারে এখনও শত শত রাজনৈতিক বন্দি আটক রয়েছেন। এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনেরই মুক্তি নিশ্চিত হওয়া গেছে। জর্জে রদ্রিগেজ বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকার এই বন্দিদের মুক্তি দিচ্ছে।
’
মাদুরোর কট্টর সমালোচক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রোসিও সান মিগুয়েলই প্রথম বন্দি, যার মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তার পরিবার নিউইয়র্ক টাইমসকে জানায়, মুক্তির পর তাকে কারাকাসে অবস্থিত স্পেনের দূতাবাসে নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সান মিগুয়েলের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রেসিডেন্টকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগও ছিল। তার গ্রেপ্তারে মানবাধিকার কর্মীরা বিস্মিত হন।
দীর্ঘদিন তার অবস্থান অজানা থাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর একে সম্ভাব্য ‘জোরপূর্বক গুম’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই খবরে আশাবাদ প্রকাশ করেছে। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও, ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আটক করে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের ঘোষণা দেওয়ার পর এই অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, কুখ্যাত এল হেলিকোইদে কারাগারে এখনও ৫০ থেকে ৮০ জন বন্দি আটক রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরোকে আটক করার পর এই কারাগার বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এল হেলিকোইদে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাতি অর্জন করে রাজনৈতিক বিরোধীদের আটকের জন্য। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে সেখানে প্রহার ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করার মতো নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো সবারবার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ফক্স নিউজের অনুষ্ঠান হ্যানিটি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মাচাদো সম্ভবত আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে আসবেন। এর আগে মাচাদো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক শন হ্যানিটিকে জানান, তিনি তার নোবেল শান্তি পুরস্কারটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে দিতে চান। হ্যানিটি জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমার জন্য বড় সম্মানের বিষয় হবে।’
ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে, সরকার ভিন্নমত দমন ও সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে আটককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
২০২৪ সালের বহুল বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধীদের দাবি, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক সাবসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার অস্বীকার করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় কোনো রাজনৈতিক বন্দি নেই। তাদের দাবি, যাদের আটক করা হয়েছে, তারা প্রকৃত অপরাধে জড়িত থাকার কারণেই গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি





