ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিলে ভয়াবহ প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনেয়ির নেতৃত্বের সমালোচনা করার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, খামেনেয়ির দিকে বাড়ালে সেই হাত কেটে ফেলা হবে। মূলত সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হাজারও মানুষের মৃত্যু, ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির বিরুদ্ধে কোনও ধরনের পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। মঙ্গলবার ইরান সরাসরি সতর্ক করে জানায়, খামেনির বিরুদ্ধে আগ্রাসী কোনও পদক্ষেপ নেয়া হলে তারা শুধু সেই হাত কেটে ফেলবে না, বরং প্রতিপক্ষের ‘পুরো বিশ্বে আগুন ধরিয়ে দেবে’।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল আবুলফজল শেকারচি বলেন, ‘ট্রাম্প জানেন— আমাদের নেতার দিকে যদি আগ্রাসনের কোনও হাত বাড়ানো হয়, আমরা শুধু সেই হাত কেটে ফেলব না, তাদের পুরো পৃথিবীতে আগুন ধরিয়ে দেব’। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার পলিটিকোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে খামেনেয়িকে আক্রমণ করে বলেন, তিনি ‘একজন অসুস্থ মানুষ, তার উচিত নিজের দেশ সঠিকভাবে চালানো এবং মানুষ হত্যা বন্ধ করা’। একইসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের কঠোর দমন-পীড়নের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। দুর্বল অর্থনীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্প এই পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য দুটি ‘রেড লাইন’ টেনে দেন। সেগুলো হলো— শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা এবং আন্দোলনের পর গণহারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা।
এদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থান করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। মালাক্কা প্রণালি দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিমানবাহী এই রণতরী ও তার সঙ্গে থাকা তিনটি ডেস্ট্রয়ার পশ্চিম দিকে যাচ্ছে।
যদিও নৌবাহিনী বা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সরাসরি বলেননি যে এই রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে কিনা। তবে ভারত মহাসাগরে তাদের বর্তমান অবস্থান ও গতিপথ ইঙ্গিত দিচ্ছে— এটি কয়েক দিনের মধ্যেই ওই অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন কোনও রণতরী বহরের হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০২৪ সালেও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর গত বছরের জুনে ইউএসএস নিমিৎজ রণতরী বহরকেও ওই অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
এদিকে ইরানে আন্দোলন পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি মঙ্গলবার জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪ হাজার ৫১৯ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের ভেতরে থাকা এক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করে তারা এই হিসাব করেছে। তবে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি।
সংস্থাটির মতে, সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটি ইরানে যেকোনও আন্দোলন বা অস্থিরতায় সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। এতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার বিশৃঙ্খলার স্মৃতি ফিরে এসেছে। যদিও গত কয়েক দিন ধরে কোনও বড় বিক্ষোভ হয়নি, তবু ৮ জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য ধীরে ধীরে সামনে আসছে এবং এই কারণে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত শনিবার খামেনেয়ি বলেন, বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এর জন্য তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। এটিই ছিল ইরানি কোনও শীর্ষ নেতার কাছ থেকে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ২৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে আটক অনেকেরই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
এদিকে ইরানের জাতীয় পুলিশপ্রধান জেনারেল আহমাদ রেজা রাদান বলেছেন, যারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবে, তাদের তুলনামূলকভাবে কম শাস্তি দেয়া হবে।
সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যারা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ফাঁদে পড়ে তাদের সৈন্যে পরিণত হয়েছে, তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ আছে। আত্মসমর্পণ করলে অবশ্যই শাস্তি কমানো হবে। তাদের তিন দিনের সময় দেয়া হলো’। তবে তিন দিন পর কী হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ





