ইসরাইলি ড্রোনের একটানা গুঞ্জন আর চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই গাজার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াতে। দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের মনোবল যে ভাঙেনি, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজার একদল কুরআন হাফেজ।
সোমবার (১৬ মার্চ) দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের ক্ষতিগ্রস্ত আল-শাফি মসজিদে সমবেত হয়েছিলেন ২৫৬ জন হাফেজ। তাদের লক্ষ্য ছিলÑ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এক বসাতেই পুরো কুরআন তিলাওয়াত করা। ‘সাফওয়াত আল-হুফফাজ’ বা ‘সেরা হাফেজদের সম্মেলন’ শীর্ষক এই আয়োজনটি এখন গাজাবাসীর কাছে কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রতিরোধের এক আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সাদা পোশাক পরিহিত এই হাফেজদের সারিতে ছিলেন ৫১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-কিরানাউই। ছোটবেলায় দৃষ্টিশক্তি হারানো এই হাফেজ বলেন, “কুরআনই আমার সারজীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া বা মসজিদ ধ্বংস হওয়া কোনো কিছুই আমাকে তিলাওয়াত থেকে দূরে রাখতে পারেনি। আজ আমি এখানে এসেছি আমার হারানো দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তে পাওয়া এই মহিমান্বিত উপহারকে হৃদয়ে ধরে রাখতে।”
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১৩ বছর বয়সী কিশোর আব্দুল রহমান আবু নিমর জানায়, যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেই সে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছে। সে বলে, “ইসরাইলি হামলায় আমি আমার বাড়ি, চাচা এবং অনেক বন্ধুদের হারিয়েছি। কিন্তু এই তিলাওয়াতের আসর আমাকে সেই শোক ভোলার শক্তি দেয়।” গাজার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজার প্রায় ১,০০০ এর বেশি (প্রায় ৮৯ শতাংশ) মসজিদ সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তাবু বা খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী মসজিদ তৈরি করে ধর্মীয় শিক্ষা ও তিলাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন ফিলিস্তিনিরা।
আয়োজক সংস্থা ‘দার আল-কুরআন অ্যান্ড সুন্নাহ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক আহমেদ আল-সাফিন বলেন, “গাজার এই হাফেজরা বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছে যে, গাজা অপরাজেয়। আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা গেলেও আমাদের আত্মা এবং বিশ্বাসের ভিত উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।” তীব্র খাদ্য সংকট, তেলের অভাব আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুর আশঙ্কার মাঝেও এই কুরআন তিলাওয়াতের আসর গাজাবাসীর মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করছে। সূর্যাস্তের সাথে সাথে পুরো কুরআন খতম করে এই হাফেজরা আবার ফিরে গেছেন তাদের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে, তবে বুকে নিয়ে গেছেন এক নতুন মানসিক শক্তি। সূত্র : আল-জাজিরা।





