ঢাকা   মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রেডিও বার্তা
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ইরান ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার ক্ষমতা রাখে: মিডলইস্ট আই

Authorরেডিও বার্তা ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম

ইরান ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার ক্ষমতা রাখে: মিডলইস্ট আই

ইরানের দীর্ঘ ইতিহাসে বারবার বিদেশি আগ্রাসনের মুখে পড়ার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ সামরিক অভিযান দেশটির ওপর এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৫ মার্চ রাজধানী তেহরানে বড় ধরনের বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হলেও ইরানিদের চোখে এটি কেবল বর্তমানের সংঘাত নয় বরং হাজার বছরের ঐতিহ্যের ওপর আসা এক প্রাচীন পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি মাত্র। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ হামিদ দাবাশি এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন এমন এক সভ্যতা হিসেবে, যা ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার ক্ষমতা রাখে।

ইরানি জনগণের ঐতিহাসিক স্মৃতি অত্যন্ত প্রখর এবং গভীর। তাদের কাছে খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৪ অব্দের আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয় কিংবা সপ্তম ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরব ও মঙ্গোল আক্রমণ কোনো সুদূর অতীত নয় বরং বর্তমান চেতনারই অংশ। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ইরান বারবার দখলদারদের পদতলে পিষ্ট হলেও তার সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার শিকড় কখনো উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। বর্তমানের এই সংকটকে ইরানিরা তাদের সেই সহস্রাব্দের লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই দেখছে, যেখানে প্রতিটি আগ্রাসন দেশটিকে ভেতর থেকে আরও বেশি একতাবদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই যুদ্ধের মূল নকশাকার ইসরায়েল এবং এর নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের পর এখন ইরানের ওপর এই মারণযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, এটি মূলত বসতিস্থাপনকারী ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্য বিস্তারের চরম বহিঃপ্রকাশ। অভিযোগ উঠেছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে মার্কিন সাম্রাজ্যকে ব্যবহার করে ইরানকে ধ্বংস করার যে নীল নকশা এঁকেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তারই চূড়ান্ত রূপ।

ইরানের সার্বভৌমত্ব কেবল কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা সরকারের ওপর নির্ভর করে না বরং এর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে দেশটির বিচিত্র ও বহুত্ববাদী জনগণের মাঝে। আচেমানীয় থেকে সাফাবিদ এবং তারও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজবংশের পতন ঘটলেও ইরানের জাতীয় সত্তা ও স্বকীয়তা সব সময় অটুট ছিল। ঐতিহাসিকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে রাশিয়ার আক্রমণ কিংবা ১৯৮০-র দশকে ইরাকি আগ্রাসনও ইরানকে দমাতে পারেনি। বরং প্রতিটি আঘাতের পর ইরানের শিল্প, সাহিত্য এবং বিজ্ঞান এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বর্তমান এই আগ্রাসনের একটি নিষ্ঠুর দিক হলো ইরানের নাগরিক অবকাঠামো এবং প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা। অভিযোগ করা হচ্ছে, ইসরায়েল কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতা নয় বরং দেশটির পাঁচ হাজার বছরের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে মুছে ফেলতে চায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিল্পকলা পর্যন্ত সবকিছুর ওপর এই আঘাত মূলত একটি সমৃদ্ধ সভ্যতাকে শিকড়হীন করার প্রচেষ্টা। তবে ইরানি বুদ্ধিজীবীদের দাবি, যারা ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে তারা ইরানের গভীর শিকড় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরেও জনমতে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। দেখা যাচ্ছে, আমেরিকান জনগণের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েলি নীতির বিরোধিতা করছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছে। এমনকি পশ্চিমা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা অনেক আমেরিকানকেই তাদের নিজ দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর অদক্ষতা এবং দুর্নীতির সমালোচনা থাকলেও বিদেশি আগ্রাসনের সামনে সাধারণ মানুষ তাদের মাতৃভূমির অস্তিত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর। রাজতন্ত্রের অনুসারী বা সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা যারা এই আক্রমণকে সমর্থন করছেন, তারা সাধারণ ইরানিদের চোখে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। দেশের ভেতরের রাজনৈতিক মতভেদ ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতার সুরক্ষা।

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল বিজিত হতে জানে না বরং বিজেতাদেরই জয় করতে জানে। আলেকজান্ডার থেকে মঙ্গোল পর্যন্ত সব দখলদারই শেষ পর্যন্ত ইরানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কাছে নতি স্বীকার করেছে। বর্তমানের এই ধ্বংসযজ্ঞ এবং কার্পেট বোমাবর্ষণ সাময়িকভাবে দেশটিকে ক্ষতবিক্ষত করলেও ইরানিদের লৌহকঠিন ইচ্ছা শক্তির কাছে এই আধুনিক বর্বরতা পরাস্ত হবে বলেই দেশটির নাগরিক সমাজ বিশ্বাস করে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পতাকাটি আজ কেবল একটি কাপড়ের টুকরো নয় বরং সহস্র বছরের টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক।

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...
✕
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন