বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পক্ষ থেকে বিকল্প সংযোগপথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য হিন্দু-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন যে পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তা হলো— কলকাতা বন্দর থেকে মিয়ানমার হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশের সমুদ্রপথ। এই পথটি বাংলাদেশের ভূখণ্ড এড়িয়ে সরাসরি উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে যুক্ত করবে।
🛣️ নতুন এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প: শিলং থেকে শিলচর
ভারত সরকার মেঘালয়ের শিলং থেকে আসামের শিলচর পর্যন্ত ১৬৬.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটি নির্মাণ করছে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড (NHIDCL)।
এই সড়কটি এনএইচ-৬ বরাবর নির্মিত হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রথম হাই-স্পিড করিডর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
🌐 বাংলাদেশ ছাড়াই কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল
এই করিডর যুক্ত হবে কালাদান মাল্টি-মডাল ট্রানজিট প্রকল্পের সঙ্গে, যা মিয়ানমারের সিত্তে সমুদ্রবন্দরকে মিজোরামের জোরিনপুই পর্যন্ত যুক্ত করেছে নদীপথ ও সড়কপথে। ফলে বাংলাদেশ ব্যবহার না করেও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
ভারতের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রকল্পকে "বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত জবাব" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি বলেছিলেন, “উত্তর-পূর্ব ভারত ভূবেষ্টিত; এই অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশই একমাত্র মহাসাগরীয় প্রবেশদ্বার।” তাঁর এই মন্তব্যই ভারতের বিকল্প পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করেছে বলে জানানো হয়েছে।
🔍 বাংলাদেশে প্রকল্প স্থগিত, বিকল্প পথে নজর
বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে ভারত তিনটি রেল প্রকল্প স্থগিত করেছে এবং আরও পাঁচটি প্রকল্পের জরিপ কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে। এসব প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি রুপি।
এই প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের রেলপথ ব্যবহার করে ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের চাপ কমানো। তবে বর্তমানে ভারত ভুটান ও নেপাল হয়ে নতুন বিকল্প সংযোগপথ তৈরির দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে। এই নতুন পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে ৩৫০০ থেকে ৪০০০ কোটি রুপি।
📉 রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.৯ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশ এখনো ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কৌশলগত উদ্বেগ নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করছে।
ভারতীয় কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন— বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত অর্থ বা নির্মাণসামগ্রী পাঠানো বন্ধ থাকবে, তবে ভারতের নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রকল্পের কাজ চলবে।
📌 উপসংহার:
ভারতের এই কৌশলগত পরিকল্পনা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিকল্প সংযোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে দিল্লি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাইছে। এদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেই দুই দেশের সম্পর্ক ও সংযোগ আবার স্বাভাবিক হতে পারে— এমনই আশাবাদ সংশ্লিষ্ট মহলের।





