ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশে ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী। গত কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে একজন পেশাদার কূটনীতিকের (আইএফএস) বদলে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি দিল্লিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ঘোষণা আসেনি, তবে গত রবিবার থেকেই বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন।
প্রথা ভাঙার নেপথ্যে
স্বাভাবিকভাবে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশে সবসময়ই ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পাঠানো হয়। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এমনটাই ঘটে আসছে। কিন্তু এবার দিল্লির নীতিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঢাকা মিশনের জন্য একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে বিবেচনায় রাখা হলেও, গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয়ের পর সরকার তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের ধারণা, আগের সরকারগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেভাবে দৃশ্যমান ছিল, তার চেয়ে এখন একটি ভিন্ন কৌশলের প্রয়োজন। তাই প্রথা ভেঙে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যিনি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন।
কেন বেছে নেওয়া হলো দীনেশ ত্রিবেদীকে?
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি ‘রাজনৈতিক ভারসাম্য’ এবং নতুন করে আস্থা ফেরানোর জন্য এমন একজন দরকার ছিল যিনি বিতর্কিত নন। সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল তেহেলকায় প্রকাশিত এক কলামে লিখেছেন, “দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধান গুণ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার একটি নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লিগের সঙ্গে অনেক নেতা ও কূটনীতিকের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ত্রিবেদীর সেই ‘বোঝা’ নেই।”
তিনি আরও লিখেছেন, দীনেশ ত্রিবেদী জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও (গুজরাটি বংশোদ্ভূত) কলকাতায় বেড়ে ওঠায় বাংলা ভাষায় তার দারুণ দখল রয়েছে। তার এই ভাষাগত দক্ষতা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আলোচনার টেবিলে এগিয়ে রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়োগের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি ভারতের জন্য স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দিল্লি থেকে সরাসরি বার্তা পৌঁছানো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি কার্যকর হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কলকাতা-দিল্লি সেতুবন্ধন
তিস্তা বা গঙ্গার পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তিনি কলকাতা ও দিল্লির মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করতে পারবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী বলছেন ত্রিবেদী?
দায়িত্ব পাওয়ার খবর প্রকাশের পর এক ফোনালাপে দীনেশ ত্রিবেদী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় হবে। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য সায়রুল কবির খানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কবে ঢাকা পৌঁছাবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অভিনন্দন বার্তা
বিজেপির আইটি সেলের ইনচার্জ অমিত মালব্য এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ব্যারাকপুরের সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায় অভিনন্দন।’
সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরেশ প্রভুও তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন দীনেশ ত্রিবেদীর অভিজ্ঞতা ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে অবদান রাখবে।’
কে এই দীনেশ ত্রিবেদী?
দীনেশ ত্রিবেদী এক বৈচিত্র্যময় ও বর্ণিল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী। ৭৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের জীবন যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোও বেশ বিস্তৃত।
ব্যক্তিগত জীবনে দীনেশ ত্রিবেদী গুজরাটি বংশোদ্ভূত। দেশভাগের সময় তার পরিবার করাচি থেকে ভারতে চলে আসে। তবে পরবর্তীকালে তিনি দীর্ঘ সময় কলকাতায় কাটিয়েছেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি বাণিজ্য শাখায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, সেখান থেকে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়া, যে কারণে তিনি পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। এছাড়া পুনের এফটিটিআই-এ অভিনয় শেখার জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে পরে সেই পথ থেকে সরে আসেন।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দীনেশ ত্রিবেদী এক দীর্ঘ ও বিচিত্র পথ পাড়ি দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা হয়েছিল আশির দশকে। ১৯৮০ সালে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং দশ বছর সেখানে সক্রিয় ছিলেন। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি জনতা দলে যোগ দেন এবং দলটির হয়ে গুজরাট থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে সংসদে যান। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি ব্যারাকপুর থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে তৃণমূলের হয়ে তিনি আবারও রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন।
তৃণমূলের সঙ্গে তার দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল ২০১২ সাল। সে সময় তিনি ইউপিএ-২ সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু রেল বাজেটে ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল। দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক সম্পর্কের অবসান ঘটে ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন রাজ্যসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তিনি নাটকীয়ভাবে নিজের পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন এবং তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ওই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, জনগণের সেবা করার ইচ্ছা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আক্রমণের বিরোধিতা করতে না পারার মানসিক অস্বস্তি থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বার্তা বাজার/এস এইচ






