আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো এবার একযোগে একজোট হয়ে মাঠে নামছে। এই পদক্ষেপটি নির্বাচনি ময়দানে বিরোধীদের অবস্থানকে বেশ শক্তিশালী করে তুললেও, এমন একটি জোট শেষ পর্যন্ত কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
গত রবিবার সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত এবং ইয়ার লাপিদ ঘোষণা করেছেন যে, আগামী অক্টোবরের শেষে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তারা এককভাবে অংশগ্রহণ করবেন। বিরোধী এই দুই শীর্ষ নেতার ঐক্যবদ্ধ নতুন দলটির নাম রাখা হয়েছে ‘টুগেদার’। নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে এই জোটটি এখন ভোটারদের আশা এবং উদ্দীপনার ওপর ভরসা করছে।
বেনেত ও লাপিদ এখন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে তাদের সাথে আনার জন্য কাজ করছেন। তিনি সাত মাস আগে ‘ইয়াশার!’ নামে নিজের একটি দল গঠন করেছেন। আইজেনকোট ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দফতরবিহীন মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বহু ইসরায়েলি নাগরিক তাকে দেশের অন্যতম সৎ এবং সম্মানিত রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করেন। লাপিদ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বেনেতকে জানিয়েছেন যে, আইজেনকোট যদি তাদের সাথে যোগ দিতে রাজি হন, তবে তিনি তার সম্মানে যৌথ তালিকায় নিজের ২ নম্বর অবস্থানটি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।
নাফতালি বেনেত এবং ইয়ার লাপিদ অতীতে বিভিন্ন কূটনৈতিক এবং সামাজিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একাধিকবার একসঙ্গে কাজ করেছেন। সাবেক এই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা এবং সফল হাই-টেক উদ্যোক্তা নাফতালি বেনেত প্রথমে ‘জিউইশ হোম’ পার্টির নেতৃত্ব দেন এবং পরবর্তীতে ডানপন্থি, জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় দল ‘ইয়ামিনা’-র প্রধান হিসেবে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানান।
অন্যদিকে সাবেক সাংবাদিক ও লেখক ইয়ার লাপিদ ২০১২ সালে তার মধ্যপন্থি দল ‘ইয়েশ আতিদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং ইসরায়েলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারপন্থাকে রক্ষা করাই ছিল দলটির মূল আদর্শ।
এই আদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বেও, বেনেত ও লাপিদ ২০১৩ সালে নেতানিয়াহুকে বাধ্য করেছিলেন তাদের দুজনকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে তারা আবারও একসাথে কাজ করেন এবং নেতানিয়াহুকে ছাড়াই একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট সরকার গঠন করতে সক্ষম হন। একটি আবর্তন চুক্তির অধীনে বেনেত প্রথম বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং দ্বিতীয় বছর লাপিদ সেই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাদের এই যৌথ সরকার ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। তবে ২০১৩ ও ২০২১ সালের মতো নয়, এবার বেনেত ও লাপিদ নির্বাচনের আগেই নিজেদের এই জোটের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন।
ইসরায়েলের বিরোধী দলের নেতারা নির্বাচনি কৌশল নিয়ে মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিলেন। প্রথম বিকল্পটি ছিল, আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, যেখানে প্রতিটি দল যার যার নিজস্ব ভোটারদের টার্গেট করবে। তবে এর মধ্যে স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে, ছোট দলগুলো হয়তো ৪ আসনের নির্বাচনে ন্যূনতম ভোট পেতে ব্যর্থ হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোট নষ্ট করবে কিংবা অন্য দলের ভোট কমিয়ে দেবে।
অন্য বিকল্পটি ছিল একত্রীকরণ, অর্থাৎ একটি বড় রাজনৈতিক দল তৈরি করা, যা ভোটারদের মনে পরিবর্তনের হাওয়া তৈরি করবে এবং বিশ্বাস জোগাবে যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসলেই সম্ভব।
ইয়েশ আতিদ দলের আইনপ্রণেতা মেরভ কোহেন বলেন, ইসরায়েলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এবং হাঙ্গেরির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা একটি বড় রাজনৈতিক ব্লক তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা ভোটারদের কাছে এই স্পষ্ট বার্তাটি দিতে চাই যে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের সরকারকে উৎখাত করা এবং সমাজ হিসেবে আমাদের অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস করা পুরোপুরি সম্ভব।
কোহেন এখানে মূলত হাঙ্গেরির এপ্রিলের নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে হাঙ্গেরিতে দীর্ঘদিনের শাসক ভিক্টর অরবানকে পরাজিত করতে একাধিক বিরোধী দল আদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বেও একক প্রার্থীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বে জয়লাভ করেছিল।
কোহেন আরও উল্লেখ করেন যে, এই যৌথ দলটি যত বড় ও শক্তিশালী হবে, ভোটাররা তত বেশি বিশ্বাস করবে যে এর জয়ের একটি বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন যে, এই একত্রীকরণ প্রকল্পটি ২০২১ সালের মতো রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ নয় এবং ইসরায়েলের জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি ডানপন্থার দিকে কিছুটা ঝুঁকে থাকবে।
একক প্রার্থীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া বিরোধীদের তাদের প্রচারণার ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করতে দারুণভাবে সহায়তা করবে। নাফতালি বেনেত একজন তরুণ, গতিশীল নেতা, সফল উদ্যোক্তা এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, যিনি এর আগেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান সরকারের তুলনায় তার অবস্থান কিছুটা নমনীয় এবং কম আদর্শিক হওয়ায় তাকে একজন বাস্তববাদী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এত কিছুর পরও বিরোধীদের মধ্যে এখনও পূর্ণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। টাইমস অব ইসরায়েল-এর রাজনৈতিক প্রতিবেদক তাল স্নাইডার বলেন, উগ্র ডানপন্থি বিরোধী দল ‘ইসরায়েল বেইতেনু’র প্রধান আবিগডোর লিবারম্যান এই নির্বাচনি জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। স্নাইডার অবশ্য আরও বলেছেন যে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট আগামী মাসগুলোতে বেনেত-লাপিদের এই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই একত্রীকরণের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবও থাকতে পারে। ডানপন্থি ভোটারদের একাংশ লাপিদের সাথে বেনেতের এই অংশীদারত্বকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। তারা লিবারম্যান কিংবা বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের মতো ব্যক্তিত্বদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিজেদের মধ্যে বিভাজন থাকলেও, বেশিরভাগ বিরোধী দল কিছু অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি প্রদান, রিজার্ভ সেনাদের চেয়ে সেই বিশেষ সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ করা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ, ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অপরাধ এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর প্রতি অবহেলা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তীতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর থেকে হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক দীর্ঘ সময় ধরে রিজার্ভ সেনা হিসেবে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গত আড়াই বছরে ৩০০ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং এটি এবারের নির্বাচনের একটি বড় ইস্যু হতে যাচ্ছে। বেনেক ও লাপিদ উভয়েই বারবার এই অব্যাহতির বিরোধিতা করে আসছেন।
ইসরায়েলের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং গাজা সংঘাতের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন ইস্যুটির দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব থাকলেও, এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি অনেকটাই আলোচনার বাইরে রয়েছে। কোহেন নিজে দ্বিজাতি তত্ত্ব বা দুই-রাষ্ট্র সমাধানে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, এই প্রশ্নটি বর্তমানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে নেই। একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় এখনও হামাসের উপস্থিতি এবং তুরস্ক ও কাতারের সংশ্লিষ্টতা থাকায় ইসরায়েলিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া অসম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং গাজা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর এই কূটনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা উচিত।
নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি থাকলেও, বিভিন্ন জনমত জরিপ ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করছে। গত সোমবার ইসরায়েলের চ্যানেল ১১, ১২ এবং ১৩-এর প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া কেবল ইহুদি বিরোধী দলগুলোর পক্ষে ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বেশ কঠিন হবে। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেনেত-লাপিদের দল ২৪ থেকে ২৬টি আসন, আইজেনকোটের ইয়াশার! ১২ থেকে ১৫টি আসন, ইয়ার গোলানের নেতৃত্বে বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস ৮ থেকে ১০টি আসন এবং লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ৬ থেকে ৯টি আসন পেতে পারে। এর ফলে নেতানিয়াহু-বিরোধী এই ব্লকের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ থেকে ৫৯-এ। অন্যদিকে আরব দলগুলো ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এত কিছুর পরও বেনেদ এবং লাপিদ গত রবিবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ভবিষ্যৎ কোনও সরকারে তারা আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনও পরিকল্পনা করছেন না।
আপাতত এই একত্রীকরণ ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় কোনও পরিবর্তন আনছে না ঠিকই, তবে নেতানিয়াহুর দলও গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে লড়াই করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৫ থেকে ২৭টি আসন পেতে পারে। আর তার বর্তমান ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স জোটের মোট আসন দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৫৫-এর মধ্যে।
বেনেত ও লাপিদের আরব দলগুলোকে সরকারে না নেওয়ার এই অনড় সিদ্ধান্ত জোট গঠনের প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে তুলতে পারে এবং তা সরাসরি নেতানিয়াহুর পক্ষেই যেতে পারে। তবে তারা যদি বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং তাদের ওপর সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তবে তারা একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের কথা বিবেচনা করতে পারেন।
তাল স্নাইডার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, একটি সংখ্যালঘু সরকার হয়তো খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। তবে এটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করতে পারে। তিনি যুক্তি দেন যে, এমনকি স্বল্পকালীন বেনেত-লাপিদ সরকারও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে। কারণ বেনেতকে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী রেখে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা অপরাজেয় নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুর যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রয়েছে, তা চিরতরে ভেঙে দিতে পারে।
সূত্র: আল-মনিটর






