কল্পনা করুন একটি শান্ত পাহাড়। যেখানে পাথরের নিস্তব্ধতা আর বাতাসের হাহাকার ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু পাহাড়ের ঠিক ১৬০০ ফুট গভীরে গড়ে তোলা হয়েছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক গোলকধাঁধা। যেখানে সারি সারি সাজানো আছে হাজার হাজার মারণাস্ত্র। একেকটি মিসাইল যেন একেকটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। এখানে ঘড়ির কাঁটা চলে না, চলে শুধু নির্দেশের অপেক্ষা। একটি মাত্র সিগন্যাল—আর মুহূর্তেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে প্রলয়। শত্রুর ডেরায় নরক নামিয়ে দিতে এদের সময় লাগবে মাত্র কয়েক মিনিট।
না, এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়। এটাই ইরানের সেই গোপন দুনিয়া, যাকে বলা হয় ‘মিসাইল সিটি’। যার নাগাল পায় না যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘বাংকার বাস্টার’ বোমাও। গত কয়েক দশকে ইরান মাটির নিচে এমনই এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, যা আমেরিকা-ইসরাইলের জন্য এখন মাথাব্যথার কারণ। সাম্প্রতিক সংঘাতে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ ছিল ইরানের এই মিসাইল সিটিগুলো।
ইরানের মিসাইল সিটি কী?
মিসাইল সিটি মূলত ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস’ বা আইআরজিসি পরিচালিত পাহাড়ের নিচে বা ভূগর্ভে নির্মিত বিশাল সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স। আন্তর্জাতিক সামরিক গবেষণা সংস্থা সিএসআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, এগুলো সাধারণ কোনো অস্ত্রের গুদাম নয়। এগুলো একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ যুদ্ধকেন্দ্র। এই শহরগুলো মাটির ৫০০ মিটার বা ১,৬০০ ফুটেরও বেশি গভীরে অবস্থিত। যেখানে মিসাইল তৈরি, মজুত এবং উৎক্ষেপণ করা যায়।
যেহেতু এই সুড়ঙ্গগুলো মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত, তাই এগুলোকে বলা হয় ‘মিসাইল সিটি’ বা ‘ক্ষেপণাস্ত্রের শহর’।
মিসাইল সিটির ভেতরে কী আছে?
২০১৫ সালে ইরান প্রথমবারের মতো মিসাইল সিটিগুলো প্রকাশ্যে আনে। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইরানের এই গোপন দুনিয়ার বেশ কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করে আইআরজিসি। যা দেখে সারা বিশ্ব অবাক হয়েছিল।
কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভূগর্ভে ইরানের বিশাল অস্ত্রের ভান্ডার। যেখানে সারি সারি সাজানো আছে ‘ইমাদ’, ‘খাইবর শিকান’ এবং অতি সম্প্রতি উন্মোচিত ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক মিসাইল। হজ কাসেম, সেজ্জিল আর পাভেহ্ ক্রুজ মিসাইলের ছবিও ভিডিওতে দেখা যায়।
ইরান দাবি করে, এসব মিসাইল দুই হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও হামলা চালাতে সক্ষম। অর্থাৎ এই মিসাইলগুলো ইসরাইল, সৌদি আরব, ভারত, রাশিয়া আর চীনে হামলা চালাতে পারবে।
শুধু ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, মিসাইল সিটিতে ইরান কিছু যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধ জাহাজও লুকিয়ে রেখেছে। মিসাইল সিটির সবচেয়ে অদ্ভুত প্রযুক্তি হলো ‘রেল-মাউন্টেড লঞ্চার’। মিসাইলগুলো সুড়ঙ্গের ভেতর রেল লাইনের ওপর ট্রেনের মতো বসানো থাকে। ফলে খুব দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া যায়।
এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্য এর ভেতরে রয়েছে বিশাল বিশাল পানির ট্যাংক, জেনারেটর, সেনাদের থাকার জন্য আধুনিক ব্যারাক ও হাসপাতাল। ফলে মাটির ওপরের সামরিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলেও, মাটির নিচের এই শহরগুলো মাসের পর মাস যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
কোথায় আছে ইরানের মিসাইল সিটিগুলো?
প্রথমত, জাগরোস পর্বতমালা। ইরানের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত এই বিশাল পাহাড়ের কঠিন পাথর ভেদ করে তৈরি করা হয়েছে প্রধান ঘাঁটিগুলো। দ্বিতীয়ত, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল। এখান থেকে ইরান খুব সহজেই জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইল ছুঁড়তে পারে। এছাড়া জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ ‘হরমুজ প্রণালি’র কাছেও রয়েছে একাধিক সুড়ঙ্গ ঘাঁটি।
ইরান এই ঘাঁটিগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান অত্যন্ত গোপন রাখে। একইসঙ্গে এমন কতগুলো মিসাইল সিটি রয়েছে, সেই সংখ্যা কখনও প্রকাশ করেনি। তবে আইআরজিসি-এর অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ বলেছেন, ‘ইরানের প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই এ ধরনের মিসাইল সিটি রয়েছে।’ বিশ্লেষকদের মতে, এর সংখ্যা কয়েক ডজন থেকে শতাধিক পর্যন্ত হতে পারে।
কবে থেকে মিসাইল সিটি নির্মাণ শুরু?
প্রায় চার দশক আগে ইরানের মিসাইল সিটির ইতিহাস লেখা হয়। ১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী তেহরানে মুহুর্মুহু মিসাইল হামলা চালাতো। তখন ইরান বুঝতে পারে, খোলা আকাশের নিচে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিরাপদ নয়। ফলে ১৯৮৪ সালে তারা প্রথম সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু করে।
২০১৫ সালে ইরান প্রথমবারের মতো একটি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির ভিডিও প্রকাশ করে গোটা বিশ্বকে চমকে দেয়। এরপর একে একে ‘ইমাদ’ বা ‘খাইবর শিকান’-এর মতো অত্যাধুনিক মিসাইল এই সুড়ঙ্গগুলো থেকে প্রদর্শন শুরু হয়।
যুদ্ধের গেম চেঞ্জার ইরানের মিসাইল সিটি
ইরানের মিসাইল সিটিগুলো যে, যুদ্ধের মোড় ঘুড়িয়ে দিতে পারে, সাম্প্রতিক সংঘাত তার প্রমাণ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে একের পর এক হামলা চালায়। একপর্যায়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্পের সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণ করতে মোটেও সময় নেয়নি তেহরান। পরদিনই কাতার-সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। একইসঙ্গে ইসরাইলেও ছোড়া হয় শত শত মিসাইল। ধারণা করা হয়, মিসাইল সিটিগুলো থেকেই এই হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার পেছনেও রয়েছে মিসাইল সিটির অবদান। হরমুজের খুব কাছেই ইরানের একাধিক সুড়ঙ্গ ঘাঁটি। যেখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মুহূর্তেই শত্রুর জাহাজ ধ্বংস করা সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের একের পর মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের সিরিজ হামলা, হরমুজে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ- সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তখন উপায় না পেয়ে সংঘাত থামাতে আলোচনায় বসতে মরিয়া ট্রাম্প।
কেন ইরানকে হারানো অসম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল, ইরানকে ভয় পাওয়ার অন্যতম কারণ এই মিসাইল সিটিগুলো। সাধারণ কোনো বিমান হামলা, এমনকি বাংকার বাস্টার বোমা ফেলেও এগুলো ধ্বংস করা সম্ভব না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী জিবিইউ-৫৭ ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা মাটির ২০০ ফুট নিচে আঘাত হানতে পারে। সেখানে এই শহরগুলো মাটির ১৬০০ ফুট গভীরে।
মাটির গভীরে থাকায় ভেতরের মুভমেন্ট ট্র্যাক করাও সম্ভব নয়। তাছাড়া ইরান তাদের মিসাইলগুলো হাজার হাজার মাইল জুড়ে ছড়িয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত নয়, কোন পাহাড়ের নিচে কতগুলো মিসাইল তাক করা।
যদি কোনো দেশ ইরানে হামলা চালিয়ে মাটির ওপরের সব সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়, তবুও ভূগর্ভের এই শহরগুলো অক্ষত থাকবে। আর সেখান থেকে মুহূর্তেই কয়েক হাজার মিসাইল দিয়ে পাল্টা আঘাত হানা সম্ভব।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ৪০ দিনের সংঘাতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশই ব্যবহার করেনি। ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি বলেছেন, ‘শিগগিরই ইরান এমন অস্ত্র বের করবে, যা দেখে শত্রু হার্ট অ্যাটাক করতে পারে।’ ফলে ইরানের মিসাইল সিটিগুলোতে আর কি কি বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি হচ্ছে, তা ধারণারও বাইরে।






