সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার (৮ জুন) পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যেই শি জিনপিংয়ের এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাধারণত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি জিনপিংয়ের বিদেশ সফরের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশ্বের বড় বড় নেতারা যেখানে বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেখানে শি জিনপিং নিজে পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন—যা বেইজিংয়ের কাছে এই সফরের গুরুত্ব কতটা বেশি তা প্রমাণ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শি প্রতি বছর গড়ে ১৪টি বিদেশ সফর করলেও ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বার্ষিক মাত্র ৬টিতে নেমে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই আকস্মিক সফরের মূল কারণ হতে পারে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বেইজিংয়ের বাড়তে থাকা উদ্বেগ। ঐতিহ্যগতভাবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কে বেইজিং সবসময়ই ‘বড় ভাই’ বা প্রধান অংশীদারের ভূমিকায় থেকেছে। উত্তর কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে এই সমীকরণে বদল আসতে শুরু করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রেমলিনের সামরিক চাহিদাকে সচল রাখতে উত্তর কোরিয়া দেদারসে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য সরবরাহ করে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’র তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে উত্তর কোরিয়াকে সৈন্য ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে মস্কো। যার বড় অংশই স্যাটেলাইটের নজরদারি এড়িয়ে গোপন সামরিক প্রযুক্তি এবং নির্ভুল যন্ত্রাংশ হিসেবে পিয়ংইয়ংয়ের হাতে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক গবেষক ও সাংবাদিক লি সাং ইয়ং জানান, উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিধি নিয়ে বেইজিং বেশ সতর্ক। চীন মূলত উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের প্রভাব পুনরুত্থান করতে চায়, যাতে পিয়ংইয়ং পুরোপুরি মস্কোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে। এই প্রভাব বজায় রাখতে চীন উত্তর কোরিয়াকে নতুন করে বড় অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা সহায়তার প্রস্তাব দিতে পারে।
পাশাপাশি, উত্তর কোরিয়ার হাতে রাশিয়ার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি চলে আসার বিষয়টিও চীনের জন্য চিন্তার কারণ। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, বেইজিং সবসময়ই উত্তর কোরিয়াকে সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে সতর্ক ছিল। কারণ উত্তর কোরিয়া অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা কোরীয় উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
ইতোমধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে উত্তর কোরিয়া আটটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ট্যাক্টিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি কিম জং উন একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান উৎপাদনকারী কারখানাও পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়াও চীনের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের সংকট নিরসনে একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহায়তা চুক্তির খবর এবং এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের তৎপরতা বৃদ্ধিও বেইজিংকে এই অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বাধ্য করছে।
সব মিলিয়ে, কিম জং উনের ওপর রাশিয়ার ছায়া নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব এশিয়ায় নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই এখন শি জিনপিংয়ের এই সফরের মূল লক্ষ্য।
সূত্র: আল-জাজিরা।
বার্তা বাজার/এস এইচ






