মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে নিয়োজিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস অ্যাব্রাহাম লিংকনের ক্রু ও নাবিকদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ এবং দৈনন্দিন রসদ সরবরাহে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রণতরীটি ফিরিয়ে এনে এর পরিবর্তে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সম্প্রতি মার্কিন নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, একটি ক্রুজার ও একটি ডেস্ট্রয়ারসহ ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দানাং বন্দর ছেড়েছে।
এরই মধ্যে রণতরী বহরটিকে সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে যেতে দেখা গেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অংশ হিসেবেই লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর মিশন বা মোতায়েনের মেয়াদ ৬ থেকে ৯ মাস হয়ে থাকে। তবে যুদ্ধের কারণে ‘ইউএসএস অ্যাব্রাহাম লিংকন’-এর মোতায়েনের মেয়াদ প্রায় ২৬০ দিনেরও বেশি সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম রণতরী মোতায়েন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নেভি টাইমস’ ও ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটানা দীর্ঘকাল সাগরে অবস্থান করায় প্রায় ৫,০০০ ক্রুবিশিষ্ট এই জাহাজে চরম মানসিক হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকজন সদস্য জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও চালিয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে ক্রুদের পরিবার ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, চলমান মার্কিন-ইরান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সরবরাহ হাবগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে স্বীকার করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। এর ফলে জাহাজে খাবার এবং জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
পরবর্তীতে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাহাজের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ রসদকে প্রাধান্য দিয়েছে—প্রথমে খাবার, তারপর পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী এবং সবশেষে চিঠি। বর্তমানে নাবিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চিত ব্যবস্থা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
অবশ্য অবস্থার অবনতির খবর ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করি যেন প্রতিটি জাহাজ, ক্রু ও ক্যাপ্টেন সর্বোচ্চ সহায়তা পান। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমাদের নাবিকরা যেভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তা অবিশ্বাস্য।’
তবে প্রতিরক্ষা সচিবের এই মন্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতারা। কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর কাছে জবাবদিহিতা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে, অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মেরিন কোরের সদস্য রুবেন গ্যালেগো জানিয়েছেন, তিনি নিরপেক্ষ একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে সরেজমিনে জাহাজটি পরিদর্শন করতে চান। তিনি নাবিকদের সঙ্গে এমন আচরণকে ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেন।
বর্তমানে ইরান সংঘাত কিছুটা থিতিয়ে এলেও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ বলবৎ রয়েছে। পেন্টাগন এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চায় সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা না দিলেও, রণতরী বদলের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
বার্তা বাজার/ আইকে






