নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণে বেঁচে গেছেন ২৪ বছর বয়সী শ্রমিক বিবেক কুমাল। টয়লেটের গর্ত খোঁড়ার সময় হঠাৎ কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে এলে তিনি প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেন। পরে প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে একটি আমগাছে আটকে যান। সেই গাছটিই শেষ পর্যন্ত তার জীবন বাঁচায়।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমনই এক লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে।
কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন বিবেক বলেন, আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দে পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে আসে। স্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। ভাগ্যক্রমে আমি একটি আমগাছে আটকে যাই। আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভেসেই মারা যেতাম।
বিবেক কুমাল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলার নিচের দিকে বিদুর এলাকায় একটি নতুন নির্মিত বাড়ির পাশে টয়লেটের গর্ত খুঁড়ছিলেন। তখন গর্তটির গভীরতা ছিল প্রায় পাঁচ ফুট। তার সঙ্গে আরও চার শ্রমিক কাজ করছিলেন।
হঠাৎ বিকট শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান বিবেক। গর্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত বের হয়ে দৌড়াতে বলেন। তিনি গর্ত থেকে বের হওয়ার আগেই সহকর্মীরা নিরাপদ স্থানে চলে যান।
বিবেক বলেন, আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো শব্দ করে পানির বিশাল দেয়াল ধেয়ে আসে।
প্রবল স্রোত তাকে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে একটি আমগাছের সঙ্গে আটকে যান তিনি। পরে পুলিশ তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে।
স্রোতের ধাক্কা ও বড় একটি পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। তবে অন্য কোথাও থাকা তার নিজের বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ঘটনার সময় যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন, আমগাছে আটকে থাকা অবস্থায় সেটিও চোখের সামনে পানির স্রোতে ধসে যেতে দেখেন বিবেক।
বুধবার নেপালের হিমালয়সংলগ্ন চীন-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
চীনের সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজেও দেখা গেছে, কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে এসে ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বহু মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করতেও দেখা যায়।
ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জার্মান ভূবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে ধারণ করা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নদীতে বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর ধসে পড়ার পরই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
নেপাল প্রতি বর্ষা মৌসুমেই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মুখোমুখি হয়। দেশটি পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে। বিবেক নিজেও কিশোর বয়সে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
এবারের দুর্যোগে আহত আরও তিনজনের সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বিবেক। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কাঠমান্ডুর ট্রমা সেন্টারের বাইরে স্বজন, বন্ধু ও স্থানীয়দের ভিড় জমেছে। আহতদের স্বজনেরা প্রিয়জনের খোঁজে হাসপাতালে ছুটে আসছেন।
হাসপাতালের পাশের একটি শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে ১১ বছর বয়সী রিহানা লামিচানে। বন্যার পানি থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে।
রিহানা জানায়, সে তখন স্কুলে ছিল। দুর্যোগের কারণে স্কুল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল স্রোত নেমে আসে।
বন্যার পানিতে তার বুক ও পায়ে আঘাত লাগে। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে রিহানা। সে বলে, আমি নিরাপদে আছি, এটাই ভালো লাগছে। আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, তা জানি না।
মেয়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসেন তার মা রিতা। মেয়েকে নিরাপদে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার মেয়ের বড় কিছু হয়নি, এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
সূত্র : রয়টার্স






