আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে নির্বাচনী ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। হাতে সময় আছে আর মাত্র ৩৬ দিন। এই সন্ধিক্ষণে জনমনে স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা ও স্থবিরতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলার কথা থাকলেও প্রশাসনের একটি বড় অংশ এখন ব্যস্ত আগামী সরকারের ‘আনুকূল্য’ পাওয়ার দৌড়ে।
সচিবালয় থেকে শুরু করে পুলিশের সদর দপ্তর—সর্বত্রই এখন আলোচনার মূল বিষয় ‘আগামীতে ক্ষমতায় কে আসছে?’। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের চেয়ে আড্ডার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক কর্মকর্তা রুটিন কাজ ফেলে রেখে রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এমনকি মধ্যম সারির কোনো কোনো কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও দেখা যাচ্ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “গোটা প্রশাসনযন্ত্র গতিপথ হারিয়েছে। সবাই দলীয় আনুকূল্য পেতে আগ্রহী। তেলবাজি ও তোষামোদি করে পদোন্নতি পাওয়াকে অনেকে মর্যাদার বিষয় মনে করছেন। এটি বিগত সরকারগুলোর দীর্ঘদিনের দলীয়করণের অনিবার্য ফল।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল নিয়ে সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। পুলিশের একটি অংশ চাচ্ছে বর্তমান নেতৃত্বের পরিবর্তন করে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে, অন্য অংশটি নির্বাচনের আগে পরিবর্তনের বিপক্ষে। আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদের পরিবর্তনের ফাইল এখন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন প্রকাশ্য বিভক্তি। একদিকে পদোন্নতির প্রত্যাশা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে নিরাপদ থাকার চেষ্টা—এই দুই মেরুর লড়াইয়ে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পুলিশিং কার্যক্রম। অনেক কর্মকর্তা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, যার ফলে ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খলা দমনে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনী ডামাডোলের সুযোগে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে, ভরা মৌসুমেও সবজির দাম আকাশচুম্বী থাকলেও তদারকি নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। সচিবালয়ের অনেক কর্মকর্তা অকপটে স্বীকার করছেন যে, এখন অফিসে এসে কেবল আড্ডা দিয়েই সময় কাটছে তাদের।
অন্যদিকে, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আভাস পেয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এরই মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং জ্বালানি সংকট দূর করার দাবি নিয়ে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এমনকি বিসিবি পরিচালক ও বাম দলগুলোর নেতারাও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর সেবা বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের স্থায়ী অংশ, তারা কোনো দলের নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের এই মেরুকরণ আগামী সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বার্তাবাজার/এমএইচ





