সরকার এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে বড় পরিসরে অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ পাঠানো হবে। এ লক্ষ্যে সরকার দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এককালীন অর্থ বিতরণ কর্মসূচি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার প্রথমবারের মতো আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো ধরনের সুযোগ না থাকে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক জানিয়েছেন, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর নেয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কেউই অবসর সুবিধার অর্থ পাননি। দীর্ঘদিন ধরে অর্থের অপেক্ষায় থাকা এসব মানুষ নানা ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারী গড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। তবে চূড়ান্ত হিসাব এখনও প্রস্তুত করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপুল সংখ্যক আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অর্থ বিতরণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে মোট প্রায় এক লাখ ১০ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডে রয়েছে ৬৭ হাজারের বেশি আবেদন, যার জন্য প্রয়োজন প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে জমা রয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার আবেদন, যা নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অথচ কল্যাণ ট্রাস্টের হাতে বর্তমানে রয়েছে মাত্র প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
সরকারের ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রায় ৭৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থও পাবেন। তবে শিক্ষক সমাজের একটি অংশের মধ্যে এখনও সংশয় রয়েছে, তারা বিধিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ পাওনা পাবেন নাকি আপাতত শুধু মূল অর্থ পরিশোধ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধ, আপাতত কেবল শিক্ষকদের কাছ থেকে কেটে রাখা মূল অর্থ ফেরত দেয়া কিংবা প্রথমে মূল টাকা এবং পরে অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট মোকাবিলায় দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার নির্দেশ দেন।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থ না পাওয়ার কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খুলনার ফুলতলা উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শামসুর রহমান জানান, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৩ বছর ৬ মাস চাকরি শেষে অবসরে যাওয়ার পরপরই তিনি আবেদন করেছিলেন। প্রায় চার বছর পার হলেও এখনও তিনি কোনো অর্থ পাননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার ঢাকায় গিয়ে শুধু অপেক্ষার আশ্বাস নিয়েই ফিরতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, সারাজীবন শিক্ষকতা করেও অবসরের পর চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহের শফিকুল ইসলাম ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাজমা আক্তার। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর আবেদন ঝুলে থাকায় চিকিৎসা ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে সৃষ্টি হওয়া সংকটের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিনের অর্থসংকট। পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ এবং পরিচালনা কমিটির অকার্যকারিতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এছাড়া সফটওয়্যার সমস্যার কারণে আবেদন যাচাইয়ের কাজ দীর্ঘদিন ব্যাহত হয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তহবিলে নগদ অর্থের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সমস্যাও আবেদন নিষ্পত্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ায় ডিজিটালভাবে আবেদন যাচাই কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে প্রতিটি আবেদন হাতে-কলমে যাচাই করতে হচ্ছে, যার কারণে একটি আবেদন নিষ্পত্তিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।
অবসর সুবিধার অর্থের একটি বড় অংশ শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকেই সংগ্রহ করা হয়। চাকরিকালীন সময়ে তাদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ অবসর তহবিলের জন্য এবং আরও ৪ শতাংশ কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য কেটে রাখা হয়। এছাড়া বর্তমানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বছরে নির্ধারিত হারে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপরও প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা বছরে প্রায় ৫০৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, সরকারের নতুন উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এটি পুরো সংকটের সমাধান নয়। তাদের মতে, শুধু মূল অর্থ নয়, দীর্ঘদিন বিভিন্ন ব্যাংকে বিনিয়োগ করা অর্থের মুনাফাসহ বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা তহবিল দ্রুত উদ্ধার না করা গেলে ভবিষ্যতেও অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে লক্ষাধিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে, কেউ সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও মেটাতে পারছেন না। তাই দ্রুত সব আবেদন নিষ্পত্তি করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধের দাবি জানান তিনি।






