ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় সংসদ সচিবালয়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় সংসদ। এ লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলের হুইপদের সমন্বয়ে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং অফিস নথি তলবের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদের মূল ভবনে ব্যবহৃত অফিস কক্ষ পুনর্বিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিষয় পর্যালোচনায় গঠিত এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সরকারদলীয় হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানকে। আট সদস্যের কমিটির অন্যরা হলেনÑসংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সরকারদলীয় হুইপ জিকে গউছ, রকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (বিরোধীদলীয় হুইপ) রফিকুল ইসলাম খান।
গত ১৬ আগস্ট সংসদ সচিবালয় থেকে কমিটি গঠনের আদেশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের মূল ভবনের ব্যবহৃত অফিস কক্ষগুলোর পুনর্বিন্যাস, গণপূর্ত অধিদপ্তরের দাপ্তরিক স্থান ব্যবহারের যৌক্তিকতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের প্রস্তাব এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ও অন্য হুইপদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল এ কমিটি গঠন করেন।
কমিটিকে বেশকিছু কাজের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম বিগত ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সংঘটিত বেআইনি, অনৈতিক বা দলীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা তৈরি করে তাদের বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করা।
নতুন সরকার গঠনের ছয় মাস পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য যাচাইয়ের ইস্যু কেন এলোÑজানতে চাইলে সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ একে অপরকে ‘ফ্যাসিবাদী’ ট্যাগ দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। আবার বিগত সরকারের সময় সুবিধাভোগী একাধিক কর্মকর্তা ভোল পাল্টে বর্তমান সরকার দলপন্থি হিসেবে জাহির করে নানা সুবিধা নিচ্ছেন। কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিষয়টি স্পিকার, চিফ হুইপসহ অন্য হুইপদের নজরে আনার কারণে তা কমিটির এখতিয়ারভুক্ত করা হয়েছে।
কার্যপরিধিতে আরো বলা আছে, প্রয়োজনবোধে কমিটি যেকোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সভায় আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য, ফ্লোর প্ল্যান ও প্রতিবেদন সংগ্রহের ক্ষমতাও থাকবে কমিটির।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, কমিটিকে অনেকগুলো বিষয়ে কাজ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বিষয়ও আছে। বিষয়টি চিহ্নিত না হলে তো কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছি। নানা ঘটনা ঘটেছে। সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে আমরা এখনো ভোগান্তির মধ্যে আছি। গণমাধ্যম বিষয়টি অনুসন্ধান করতে পারে। এটা সাবোটাজ কি না সেটাও ভাবনার বিষয়। অনেককিছুই আছে। ভূত তো সব জায়গায় রয়ে গেছে।
কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, সংসদ ভবন একটি কেপিআই এলাকা। এখানে সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, সাড়ে ৩০০ সংসদ সদস্য থাকেন। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কাজ হচ্ছে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে প্রজাতন্ত্র কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু অতীতে অনেক অতি উৎসাহী কর্মচারীকে বাড়াবাড়ি করতে দেখেছি। তাদের চিহ্নিত করা উচিত। না হলে সাবোটাজের আশঙ্কা থাকে। কেউ এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, আমরা তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করতে চাই। কাউকে আঘাত বা বের করে দিতে চাই না।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা আছে, কমিটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের জন্য বর্তমানে ব্যবহৃত অফিস কক্ষগুলোর অবস্থান, আয়তন ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা
করবে। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিচতলায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু এবং প্রয়োজনীয় এলাকা নির্ধারণ করে স্পিকারের কাছে সুপারিশ দেবে।
এছাড়া সংসদ ভবন এলাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তর ও শাখা কোথায়, কী পরিমাণ এবং কোন উদ্দেশ্যে অফিস কক্ষ ব্যবহার করছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করবে কমিটি। এসব কক্ষ ব্যবহারের যৌক্তিকতাও যাচাই করা হবে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত অফিস কক্ষ কমানো, একীভূতকরণ, পুনর্বণ্টন ও স্থানান্তরের বিষয়েও কমিটি সুপারিশ দেবে।
গণপূর্ত বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, লুই কানের নকশায় ভবনের কক্ষের সংখ্যা থাকার কথা ৪০০। কিন্তু এখন আছে ৫০০’রও বেশি। সংসদ সচিবাল বড় কক্ষগুলোয় কাঠের বিভাজন দিয়ে অসংখ্য ছোট কক্ষ তৈরি করেছে।
সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তি জানান, সংসদের মূল ভবনে ৪০০’র অধিক কক্ষ থাকলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদীয় কমিটির সদস্যদের রুম বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না। কোনো কোনো শাখা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রুম বরাদ্দ নিয়েছে। আবার কিছু শাখা প্রয়োজনের চেয়ে কম রুম বরাদ্দ পেয়েছে। এক্ষেত্রে অধিবেশন চলার সময় জরুরি সহায়তা দেওয়া শাখাগুলোকে অধিবেশন কক্ষের কাছাকাছি রুম বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আবার মূল ভবনের বাইরে সংসদ সচিবালয় এলাকায় গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয় থাকার পরও মূল ভবনের মধ্যে বেশকিছু কক্ষ তাদের বরাদ্দ দেওয়া আছে। বিষয়টি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন সংসদের কর্তাব্যক্তিরা। তাদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী রুম বরাদ্দ দেওয়া হলে মূল ভবনের ভেতরের সব সংসদীয় কমিটির সভাপতিকে রুম বরাদ্দ দেওয়া যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, লুই কানের স্থাপত্য জাতীয় সংসদ ভবনের স্পেসগুলো বর্তমানে অবিন্যস্তভাবে রয়েছে। আমরা এগুলোকে বিন্যস্ত করতে চাই। ভবনে কার কতটুকু জায়গা প্রয়োজন, কোন বিভাগে বেশি বা কম জায়গা দরকার এবং কোনটা কোন তলায় নেওয়া উচিতÑতা বিচার-বিবেচনা করে রিপোর্টের মাধ্যমে পুনর্বিন্যাস করা হবে।






