টিসিবির ভর্তুকির পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ
এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : ভর্তুকির পণ্য বিতরণে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অপচয় ও প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তের চ্যালেঞ্জ কাটাতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) যাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থায়।
ডিজিটাল টিসিবি কার্ড, ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ডিলার ব্যবস্থাপনা, অল-ইন-ওয়ান পিওএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ভর্তুকির পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার টিসিবির সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রযুক্তি হবে মানুষের জন্য, সেবা হবে সহজ, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ।’ এ উদ্যোগের বড় পরিবর্তন হচ্ছে-কার্ড হারিয়ে গেলেও প্রকৃত উপকারভোগী পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না। ‘উপকারী’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল পরিচয় ও এনক্রিপ্টেড কিউআর কোড ব্যবহার করে উপকারভোগীর পরিচয় এবং পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে। ফলে কাগজনির্ভরতা কমার পাশাপাশি একজনের কার্ড অন্যজনের ব্যবহারের সুযোগও কমবে।
৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী বাদ : টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তরের আগে উপকারভোগীর তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে সরকারি ভর্তুকি প্রকৃত ও যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া বা অযোগ্য ব্যক্তির তালিকায় থাকার মতো ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
টিসিবির নতুন ব্যবস্থায় অল-ইন-ওয়ান পিওএসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদের ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পণ্য বিতরণ হচ্ছে, বিক্রির গতি কেমন এবং কোথাও অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে কি না-এসব তথ্য তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
উপকারভোগীদের তথ্য ও সহায়তা দিতে এআইভিত্তিক কন্ট্রাক্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগও রয়েছে। ডিলার ব্যবস্থাপনাতেও আসছে পরিবর্তন। অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।
আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। অনলাইন পেমেন্ট কালেকশনের ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাশ্রয় হতে পারে ৩৫০ কোটি টাকা : বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তর ও বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা সংস্কারের ফলে চলতি অর্থবছরে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তি, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের সরবরাহব্যবস্থায় এখনো উৎপাদক থেকে ভোক্তাপর্যায়ে দামের বড় ব্যবধান রয়েছে। কোথাও কোথাও সাময়িক সরবরাহ ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ভোক্তা অধিকারেও ডিজিটালের ছোঁয়া : একদিকে টিসিবির ভর্তুকির পণ্য বিতরণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অন্যদিকে বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে অধিদপ্তরে জনবল, প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পর্যায়ক্রমে বিদ্যমান সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভর্তুকির পণ্য বিতরণে উপকারভোগী শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ডিলার নিয়োগ, পণ্য বিক্রি, লেনদেন ও নজরদারি-পুরো ব্যবস্থাপনাই ধীরে ধীরে তথ্যনির্ভর ও ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে আসবে।






