পুলিশ বাহিনীর কিছু পদস্থ কর্মকর্তা চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে আইন, তদন্ত ও প্রশিক্ষণভিত্তিক বই লিখছেন। এসব বইয়ের বিক্রিও হচ্ছে শত শত কপি। তবে অভিযোগ উঠেছে, বইগুলো মূলত পুলিশের অধস্তন সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিক্রি করা হচ্ছে। কেউ কেউ ঊর্ধ্বতনকে খুশি রাখতে, আবার কেউ চাকরির স্বার্থে বাধ্য হয়ে এসব বই কিনছেন।
বই লিখে আলোচনায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান, রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম) গোলাম রউফ খান এবং সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। তাঁরা অবশ্য দাবি করছেন, বইয়ের জনপ্রিয়তার কারণেই পুলিশ সদস্যরা কিনছেন, কারও ওপর চাপ প্রয়োগের প্রশ্নই ওঠে না।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের লেখা ১০টি বইয়ের সেটের বাজারমূল্য ৫২০০ টাকা হলেও ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০০ টাকায়। বইগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ভূমি আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, পুলিশ পদোন্নতি পরীক্ষা গাইডসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রচিত। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীতে পদায়নের পর থেকেই তাঁর বই কেনার জন্য অধস্তন পুলিশ সদস্যদের ওপর নানা মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা পুলিশে গত জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বই বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় থানাগুলোকে। শুধু বগুড়ার ১২টি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের ইউনিটেই কয়েক লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে।
শেরপুর থানার ওসি এস এম মঈনুদ্দিন জানান, তাঁর থানায় ৯ সেট বই বিক্রি হয়েছে। সদর থানার ওসি হাসান বাসির দাবি করেন, বইগুলো প্রয়োজনীয় এবং কেউ বাধ্য হননি। তবে শিবগঞ্জ থানার একাধিক এসআই ও এএসআই জানিয়েছেন, তাঁদেরকে ভাগাভাগি করে বই কিনতে বাধ্য করা হয়।
এক এসআই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চাকরিতে বই কিনতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এবারও চাপ এসেছিল। ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে প্রতিবাদ করার হুমকি দিয়েছিলাম।”
অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ বই না নিয়েই টাকা দিয়েছেন, আবার কোনো কোনো থানার ওসি বই কিনে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিআইজি শাহজাহান বলেন, “আমি অনেক আগে থেকেই বই লিখি। কেউ পড়তে চাইলে পড়ে। কাউকে বাধ্য করার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যদি কেউ এমন করে থাকে, সেটি দুঃখজনক। তদন্ত করে দেখব।” তিনি আরও জানান, প্রকাশনা সংস্থার কর্মীরাও কখনও কখনও থানায় গিয়ে বই বিক্রির চেষ্টা করেন।
বই বিক্রির সমন্বয় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে বগুড়া ডিবির ইনচার্জ ইকবাল বাহারের বিরুদ্ধেও। তবে তিনি বলেন, “স্যারের বই কারও কাছে বিক্রি করা হয়নি, সৌজন্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে।”
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর লেখা ‘আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণ—নবীশ থেকে পেশাদার’ বই নিয়েও বিতর্ক আছে। অভিযোগ, ২০১৯ সালে তিনি ডিএমপিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় অধস্তন সদস্যদের বইটি কিনতে বাধ্য করা হয়।
তৎকালীন ডিবির এক এসআই জানান, “আব্দুল বাতেন সাহেব নির্দেশ দিয়েছিলেন বইটি কিনতে হবে, তাই বাধ্য হয়েই কিনেছি।”
ডিআইজি কুদ্দুছ বলেন, “বইটা এখনো বহুল পঠিত। ৩৫ হাজারের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। কেউ বাধ্য হয়নি। প্রয়োজন মনে করলেই কিনেছে।”
রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম) গোলাম রউফ খান তাঁর ‘তদন্তের ময়নাতদন্ত’ বইয়ে ২৩৮টি মামলার ভুলত্রুটির কেস স্টাডি তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, বই বিক্রিতে তাঁর কোনো হস্তক্ষেপ নেই; প্রকাশনা সংস্থা থেকেই বিক্রি করে।
সরকারি কর্মকর্তাদের লেখা বই এভাবে অধস্তনদের দিয়ে কিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। এ প্রক্রিয়া অনেক সময় অস্বচ্ছ আয় বা কর ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ আছে। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি চাকরির নীতিমালা লঙ্ঘিত হয় বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, যাঁরা আসলেই আগ্রহী, তাঁরা নিজেরাই বই কিনবেন। কিন্তু বই কেনা বাধ্যতামূলক বা চাপে পড়ে করতে হলে সেটি একটি ‘সাংগঠনিক নিপীড়ন’— যা পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বার্তাবাজার/এমএইচ





