ঢাকা   রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

স্থানীয় নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়াতে চায় ইসলামপন্থি সাত দল

Authorডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১২ এএম

স্থানীয় নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়াতে চায় ইসলামপন্থি সাত দল

জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর আত্মসমীক্ষায় নেমেছে ইসলামী সাত রাজনৈতিক দল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে নতুন কৌশলে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে তারা। জোট নির্ভরতা, প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চলছে নতুন পরিকল্পনা ও তৎপরতা।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতির মাঠে কওমিপন্থি ইসলামী দলগুলোর শক্ত অবস্থান তৈরির প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, এককভাবে ২৫৮টি আসনে অংশ নিয়ে মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এককভাবে দুটি আসনে অংশ নিয়ে জামানত হারিয়েছে ইসলামী ঐক্যজোট। অন্যদিকে বিএনপি জোটের শরিক হিসেবে চারটি আসনে নির্বাচন করে কোনো আসনেই জয় পায়নি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি আসনে জয়ী হয়। একই জোটে থাকা খেলাফত মজলিস একটি আসন পেলেও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি কোনো আসনই পায়নি।

ত্রুটি খুঁজছে ইসলামী আন্দোলন

জাতীয় নির্বাচনের ফল নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন প্রকাশ্যেই আত্মসমালোচনার কথা বলছেন। প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে ভেতরে-বাইরে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, শুরুর দিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনে গিয়ে বেশকিছু আসনে জয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আদর্শগতসহ বিভিন্ন কারণে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে পারেনি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন। ধারণা করা হয়েছিল, জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ আসনে ছাড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নানা নাটকীয়তার পর ইসলামী আন্দোলন জোটে না থেকে এককভাবে ২৫৮টি আসনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মাত্র একটি আসনে জয়ী হয় দলটি। এখন নির্বাচনে নিজেদের ভরাডুবির কারণ অনুসন্ধান পূর্বক আত্মসমালোচনা করছেন ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল নেতারা।

এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘‘জাতীয় নির্বাচনে প্রথমে আমাদের একটা অবস্থান ছিল, কিন্তু শেষের দিকে জামায়াতের ‘প্রতারণা’র কারণে অবস্থান ভিন্ন হয়ে গেছে। যদি আমরা আগের অবস্থানে থাকতাম বা প্রথম থেকে আমরা একক অবস্থানে থাকতাম, তাহলে অনেক ভালো ফল হতে পারত। তা ছাড়া নির্বাচনে বিভিন্নভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। তার পরও সংকটময় সময়ে মানুষ যেভাবে আমাদের ভোট দিয়েছে, সেজন্য অবশ্যই শুকরিয়া। নির্বাচনের ফল নিয়ে দলের মধ্যে আত্মসমালোচনা আছে। আমাদের কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে, সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা আছে। সাংগঠনিকভাবে উন্নতির সর্বোচ্চ চেষ্টায় আছি।’’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে আমরা অংশ নেব ইনশাআল্লাহ। এই নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টায় আছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতার মসনদ নয়, আমাদের মূল কাজ মানুষের মধ্যে দ্বীন পৌঁছে দেওয়া। তাই সামনে যত সুযোগ আছে, আদর্শিক জায়গায় স্থির থেকে আমরা ভিন্ন কৌশলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।’

কৌশল ও জোট নিয়ে নতুন হিসাবের ইঙ্গিত দুই মজলিসে

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের মধ্যে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের আলোচনা জোরদার হয়েছে। জোটে থাকা না থাকা, প্রার্থী বাছাই ও প্রচারের ধরন; সবকিছু নিয়েই নতুন করে হিসাব কষছেন দুই দলের শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করেন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের পরই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। না হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমাদের মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই নিয়ে আমরা দলীয়ভাবে কাজ শুরু করেছি। তবে স্থানীয় নির্বাচনগুলো আমরা জোটবদ্ধভাবে করব কি না, এই বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত করিনি। দুটোরই সম্ভাবনা আছে। সময়মতো এটি চূড়ান্ত হবে। এখন আমরা সব জায়গায় দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সেক্ষেত্রে প্রচারণার কৌশল দুরকম হবে। যদি জোটবদ্ধ নির্বাচন হয়, তবে একরকম প্রচারণা হবে। আর যদি দলীয় নির্বাচন করি, তাহলে প্রচারণার কৌশল আরেকরকম হবে। তবে কিছু বিষয় তো অভিন্ন থাকবে, সেটা হলো, আমরা সংস্কার চাই। দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনীতির যে ধারাবাহিকতা, সেটার আমূল পরিবর্তন চাই। এই বিষয়গুলো আমাদের প্রচারণায় প্রাধান্য পাবে ইনশাআল্লাহ।’

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা আছে। তবে কারও সঙ্গে জোটে থাকব কি না, সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না। এখন পর্যন্ত আমরা আলাদাভাবে চিন্তা করছি। জাতীয় নির্বাচনে আমরা আশানুরূপ ফল পাইনি। তাই স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করার চেষ্টায় আছি। ভিন্ন কৌশলে এগোনোর চেষ্টা করছি।’

তৃণমূল পুনর্গঠনের চেষ্টায় জমিয়ত

এদিকে জাতীয় নির্বাচনে জোটগত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে জোর দিচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। এই লক্ষ্যে গতকাল শনিবার দলটির মজলিসে আমেলার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জমিয়তের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমাদের চারটি আসনেই বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের শক্ত বিরোধিতা ছিল। পাশাপাশি বিএনপি যাদের দায়িত্ব দিয়েছিল আমাদের আসনগুলোতে ভূমিকা রাখার জন্য, তারাও সেরকম ভূমিকা রাখেনি। তাছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের শুধু দল থেকে বহিষ্কার করা বা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা নেওয়া, এটাই তো একমাত্র সমাধান না। আমরা চেয়েছিলাম তাদের বিরোধিতার জায়গা থেকে সরিয়ে রাখতে, সেটা বিএনপির দিক থেকে ওইরকম করা হয়ে ওঠেনি। আমি মনে করি, এসব কারণে আমরা বিজয়ের কাছাকাছি গিয়েও বিজয়টা অর্জন করতে পারিনি। এখন স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে আমরা তৃণমূলকে গুরুত্ব দিচ্ছি। বেশ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন দলকে শক্তিশালী করা, জেলা লেভেলে সংগঠনকে মজবুত করা, সামনের নির্বাচন নিয়ে পরিকল্পনা করা—এসব বিষয়ে আমাদের মজলিসে আমেলায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর স্থানীয় নির্বাচনে জোট করার আপাতত কোনো চিন্তা নেই। আমরা চিন্তা করছি, আমাদের মতো করে স্থানীয় নির্বাচনে লড়ব। আমাদের প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা আশা করি এটা পূর্ণতা পাবে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে একটা হতাশা থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক, তবে সেটা কাটিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করতে যত ধরনের কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন, আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে সংসদ নির্বাচনের পর ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম কম থাকলেও ঘরোয়া কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠন চাঙা করার চেষ্টা চলছে বলে জানালেন দলগুলোর নেতারা।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমরা দুটি আসনে প্রার্থী দিয়েছি শুধু প্রতীক ও নিবন্ধন রক্ষার জন্য। এখন মাঠের প্রোগ্রাম কম, তবে আমরা ঘরোয়া প্রোগ্রামের মাধ্যমে সংগঠন গোছানোর চেষ্টা করছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশগ্রহণের পরিকল্পনা আছে।’

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমাদের নিবন্ধন নিয়ে অনেক ঝামেলা ছিল। নির্বাচন কমিশন আমাদের অনেকটা সময় ক্ষেপণ করেছে, যে কারণে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের শক্তিশালী প্রার্থীদের ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারিনি। উনাদের যদি আমরা ভালো প্রস্তুতি দিতে পারতাম, তাহলে ভালো ফল করার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থায় সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা সীমিত পর্যায়ে অংশগ্রহণ করব ইনশাআল্লাহ। সেপ্টেম্বরে আমাদের জাতীয় পরিষদের সাধারণ অধিবেশনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী তৎপরতা চলবে। পাশাপাশি আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিগুলোকে ঢেলে সাজিয়ে একটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত আমরা একটা শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থা তৈরি করতে পারব।’

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সুলতান মহিউদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে আমরা জোট ত্যাগ না করলেও ভোটের লড়াই করেছি এককভাবে। নির্বাচনের ফল নিয়ে আমরা তেমন হতাশ নই। কারণ, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতার মসনদ না, আমাদের মূল কাজ মানুষের কাছে দ্বীনের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর চিন্তা-চেতনা পৌঁছে দেওয়া। সে অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করেছি।’ স্থানীয় নির্বাচনে জোটে না থাকার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে আমরা আমাদের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। দলকে আরও গোছানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে তৃণমূলকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টায় আছি।’

সামনে ‘টেস্ট কেস’ স্থানীয় নির্বাচন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের ব্যর্থতার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা। এখানে নতুন কৌশল কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান। সব মিলিয়ে, আত্মসমীক্ষার মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন কৌশলে এগোতে চাইছে কওমি মতাদর্শের ইসলামী দলগুলো। এখন দেখার বিষয়, এ পরিবর্তন মাঠের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!