অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোও প্রার্থী তালিকা তৈরিসহ নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে দেশজুড়ে এখন নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—ঘোষিত সময়ে নির্বাচন আসলেই অনুষ্ঠিত হবে কি না। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের আলোচনায় এখন প্রধান বিষয় নির্বাচন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। বিশেষ করে জুলাই সনদ ও অনুপাতিক (PR) ভোটব্যবস্থা ঘিরে অমীমাংসিত জটিলতা অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বলেছেন, অনেক দেশে পিআর পদ্ধতি চালু থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা এখনো কার্যকর নয়। অন্যদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল এই পদ্ধতির দাবিতে সরব। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না।
জনমনে শঙ্কা ও সংশয়
রাজনৈতিক অঙ্গনের টানাপোড়েন সাধারণ মানুষের মনেও শঙ্কা তৈরি করেছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, সহিংসতার ঝুঁকি এবং ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, সঠিক সময়ে নির্বাচন না হলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে অর্থনীতি পর্যন্ত প্রভাবিত করবে।
রাজধানীর মিরপুরের এক শিক্ষক বলেন, “ভোট হলে প্রতিযোগিতা থাকতে হবে, তবেই মানুষের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু যদি কোনো পক্ষ নির্বাচনে না আসে, ফলাফল নিয়ে মানুষ আস্থা হারাবে।” একইভাবে রাজধানীর এক চা-দোকানি মন্তব্য করেন, “শুনছি দলগুলো এখনো একমত নয়। ফেব্রুয়ারিতে ভোট হবে কি না, বুঝতে পারছি না।”
দলগুলোর অবস্থান
বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণায় আস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেই। তাদের দাবি, নির্বাচন বিলম্বিত হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়বে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জুলাই সনদ সংশোধন ও পিআর পদ্ধতি চালুর বিকল্প নেই। না হলে কেন্দ্র দখল, কালো টাকা আর পেশিশক্তির প্রভাব বাড়বে।” ইসলামী আন্দোলনের নেতারাও একই দাবি তুলেছেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শুধু নির্বাচন নয়, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেছেন, “সব রাজনৈতিক পক্ষই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তাই নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবেই।”
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক মনে করেন, “নির্বাচন না হলে বহুমুখী সংকট দেখা দেবে। অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে, বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়বে। গণতন্ত্র রক্ষায় নির্ধারিত সময়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য।”
সার্বিক চিত্র
সব পক্ষ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত হলেও অনিশ্চয়তার মেঘ কাটছে না। জনগণের প্রত্যাশা—রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় বসবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাবে। কারণ কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী থেকে শিক্ষার্থী সবাই চায়, নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের চর্চা ফিরুক।






