দেশে মদ্যপান, মদ্যজাতীয় পানীয় ও জুয়া নিষিদ্ধের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘মদ ও জুয়া (নিষিদ্ধকরণ) আইন, ২০২৬’ বিল উত্থাপনের প্রস্তাব করেও তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২২তম দিনে তিনি বিলটি উত্থাপন করেন।
বিল উত্থাপনের পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য যে দুটি আইন এনেছেন, সে দুটি আইন ইতোমধ্যেই রয়েছে। আমরা এই অধিবেশনেই জুয়া আইন, ২০২৬ পাস করেছি। আর ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও তিনি যে উদ্দেশ্যে বিলটি এনেছেন, তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেকশন ২-এর সাব-সেকশন ৫, ২৪ ও ২৯ এবং সেকশন ১১ পড়লে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তাই বিলটি প্রত্যাহারের জন্য তাকে অনুরোধ করছি।’
এরপর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বিলটি প্রত্যাহার করে নেন।
পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, যেহেতু সংসদ সদস্য আইনমন্ত্রীর অনুরোধে বিলটি আর উত্থাপন না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন, তাই এটি ভোটে দেওয়া হচ্ছে না।
কেন বিলটি আনা হয়েছিল
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, মদ ও জুয়া তরুণ ও যুবসমাজের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এসবের প্রতি আসক্তি তাদের নৈতিক মূল্যবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে, অপরাধপ্রবণ করে তোলে এবং পড়াশোনা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে। সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বাড়ে।
এতে আরও বলা হয়, মদ্যপানের ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে যুবসমাজের সৃজনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ কমে গিয়ে দেশের উন্নয়নও ব্যাহত হয়।
বিলের প্রস্তাবনায় বলা হয়, সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণ এবং নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।
বিলে যেসব বিধান ছিল
বিলে ‘জুয়া’ বলতে টাকার বিনিময়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠা এবং সমাজজীবনের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এমন যেকোনও খেলাকে বোঝানো হয়েছে।
‘মদ’ বলতে নেশার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সব ধরনের পানীয় এবং দেশি মদ, দেশে প্রস্তুতকৃত বিলাতি মদ, গাঁজা, ভাঙ ও ভাঙগাছ থেকে প্রস্তুত সব ধরনের পদার্থকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়, অন্য কোনও আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও এ আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে। আইনের অধীন বাংলাদেশের অধিবাসীদের জন্য মদ পান, মদের ব্যবহার ও সংরক্ষণ এবং জুয়া খেলা নিষিদ্ধ থাকবে।
তবে চিকিৎসা, ওষুধ প্রস্তুত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ব্যবহার, বিদেশি কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং অমুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত শর্তে এ বিধান শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। জনস্বার্থে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি দিতে পারবে বলেও উল্লেখ ছিল।
তবে অনুমতি বা অব্যাহতির অপব্যবহার করলে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
শাস্তির বিধান
উত্থাপিত বিলে বলা হয়, মদ পান, অন্যকে মদপানে উদ্বুদ্ধ করা, মদের ব্যবহার বা ব্যবসায়িক বা অন্য কোনও কারণে মদ সংরক্ষণ করলে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল জুয়া খেলা, জুয়ার আয়োজন বা অন্যকে জুয়ায় প্রলুব্ধ করার ক্ষেত্রেও। অপরাধ সংঘটনে সহায়তাকারীকেও একই দণ্ডে দণ্ডিত করার প্রস্তাব ছিল।
কোম্পানির দায়
কোনও কোম্পানি এ আইনের অধীন অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিনিধিকে দায়ী করা হবে, যদি না তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে বা তা প্রতিরোধে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
কোম্পানিকে পৃথকভাবে অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত করা গেলেও তার ক্ষেত্রে কেবল অর্থদণ্ড আরোপের বিধান রাখা হয়েছিল। ‘কোম্পানি’ বলতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি কারবার, সমিতি, সংঘ বা সংগঠনকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পুনরায় অপরাধ ও বিচার
একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সর্বোচ্চ নির্ধারিত দণ্ডের দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল।
অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত সব ধরনের মদ ও জুয়া খেলার সরঞ্জাম তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বরাবর বাজেয়াপ্ত করারও প্রস্তাব ছিল।
বিলে বলা হয়, এ আইনের অধীন অপরাধ প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিচার করবেন। রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা ও দায়রা জজের কাছে আপিল করা যাবে এবং ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে।
তল্লাশি, গ্রেফতার ও মোবাইল কোর্ট
বিলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে পরোয়ানা ছাড়াই যেকোনও স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, প্রয়োজন হলে দরজা-জানালা ভেঙে প্রবেশ, জব্দ, জিজ্ঞাসাবাদ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
এতে আরও বলা হয়, এ আইনের অধীন সব অপরাধ আমলযোগ্য (কগনিজেবল) ও অজামিনযোগ্য হবে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হলে এসব অপরাধ মোবাইল কোর্টেও বিচারযোগ্য হবে।
উদ্দেশ্য ও কারণ
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, তরুণ ও যুবসমাজ বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য ও তরল পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জীবন ও সমাজকে ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু অসাধু ব্যক্তি আর্থিক লাভের আশায় জুয়া ও বিভিন্ন ধরনের লটারির আয়োজন করছে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
এতে উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ১৮(১) ও ১৮(২) অনুচ্ছেদে মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ এবং জুয়া নিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এ বিষয়ে পৃথক কোনও নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন করা হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে একটি সৎ ও কল্যাণময় সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ‘মদ ও জুয়া (নিষিদ্ধকরণ) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের জন্য বিলটি আনা হয়েছিল।






