আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সমমনা অন্তত সাতটি রাজনৈতিক দল। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর (প্রতিনিধিত্বমূলক) পদ্ধতিতে নির্বাচন, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কারসহ চার দফা দাবিতে একযোগে যুগপৎ আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কর্মসূচি সম্পর্কে আগামীকাল (সোমবার) পৃথক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সংবাদ মাধ্যমে জানান, সোমবার মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে। একই দিনে ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য সমমনা দলও তাদের নিজ নিজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিন্ন দাবিতে নতুন আন্দোলনের সূচনা করবে।
তিনি বলেন, “আগে আমরা নানা বিক্ষোভ সমাবেশ, সেমিনার ও আলোচনা সভার মাধ্যমে দাবি জানিয়েছি, কিন্তু সরকার কোনো সাড়া দেয়নি। তাই এবার আরও জোরালো কর্মসূচিতে যাবো।”
ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, “আমাদের দলসহ একাধিক রাজনৈতিক সংগঠন জুলাই সনদের আইনি কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা, পিআর পদ্ধতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। যদি সরকার এসব দাবি না মেনে নেয়, তবে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।”
বৃহৎ রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবি নিয়ে এই দলগুলো দীর্ঘদিন থেকে সোচ্চার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ঘটনার পর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হওয়ায় তাদেরও এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই যুগপৎ আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন। সঙ্গে আছে মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের খেলাফত মজলিস, নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ, মজিবুর রহমান মঞ্জুরের এবি পার্টি এবং সরওয়ার কামাল আজিজীর বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপে সন্তোষজনক ফল না পাওয়ায় এবং পিআর নিয়ে একমত না হওয়ায় এনসিপি এই সাত দলের যুগপৎ কর্মসূচিতে এখনো অংশ নিচ্ছে না। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, “আমরা গণপরিষদ নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই। কিছু দল সঙ্গে আলোচনা চলছে, যুগপৎ আন্দোলনের কথাও ভাবছি, কিন্তু এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি নিয়েও ঐক্যমত্য হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দলগুলো মনে করছে, যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, তবে ফ্যাসিবাদী দলের সঙ্গী হিসেবে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের অন্য সদস্যদের কার্যক্রম কেন নিষিদ্ধ হবে না।
দেশে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর থেকে পিআর পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র হচ্ছে। বিএনপি এ পদ্ধতির কড়া বিরোধিতা করলেও জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ ডানপন্থী ইসলামী দলগুলো এ পদ্ধতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ২৮ জুন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের আয়োজিত মহাসমাবেশে পিআর পদ্ধতির পক্ষে তাদের অবস্থান আরও জোরদার হয়। ওই মঞ্চে ১০টি রাজনৈতিক দল পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে একযোগে বক্তব্য প্রদান করেন।
বিপরীতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস তৎক্ষণাৎ পিআর পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং বলেন, “একটি গোষ্ঠী নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে জাতির সর্বনাশ করতে চায়।” বিএনপির আরও শীর্ষ নেতারা একই দাবির বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
তবে পিআর পদ্ধতির পক্ষে থাকা দলগুলো বলছে, এটি শুধু সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ নয়, বরং জনগণের স্বার্থ রক্ষার দাবি। তারা মনে করছেন, পুরনো আসনভিত্তিক পদ্ধতি নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “৫৩ বছর ধরে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়েছে, এবার দলভিত্তিক নির্বাচন প্রয়োজন। এতে ভোটের সঠিক মূল্যায়ন হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার নির্বাচনী সংস্কার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরি সংস্কার না করলে দেশ অনিশ্চয়তার দিকে যাবে। আসন্ন নির্বাচন হবে একটি বিপ্লবপরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির এই পর্যায়ে পিআর পদ্ধতি নিয়ে নতুন বিতর্ক রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াবে। বিএনপির কঠোর বিরোধিতার পরেও ইসলামি দলগুলো যেভাবে এ বিষয়ে সক্রিয় হচ্ছে, তাতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, কিছু মহল এটিকে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবেও দেখছেন।
তবে এসব দলের নেতারা বলছেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য জনগণের ঐক্যবদ্ধ দাবি বাস্তবায়ন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা।
বার্তাবাজার/এমএইচ





