গরীব চাষিদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করে সরকারি খাস জমি দখল নিয়ে তিন ফসলি প্রায় ৪০০ একর কৃষি জমি দখলে নিয়ে মাছের ঘের তৈরির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। ফসলি জমি রক্ষায় যারা বিষয়টির বিরোধিতা করেছে তাদের বসত ঘর ভাঙচুর করে গুড়িয়ে দিয়েছে চক্রটি। ইতোমধ্যে প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারেরর কাছে ক্ষতিগ্রস্তরা লিখিত অভিযোগ করলে নির্বিকার রয়েছে প্রশাসন।
সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের চরমাইজারি ও কোদালপুর লঞ্চঘাট এলাকায়।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী চক্রটি ইতিমধ্যে খনন যন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে জমি কেটে বাঁধ দেওয়া সম্পন্ন করেছে। জোরপূর্বক কৃষকের জমিসহ সরকারি খাস জমি দখল বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে চক্রটি। দেশের কৃষি নির্ভর জেলা হিসেবে শরীয়তপুর অন্যতম। এই জেলার গোসাইরহাট উপজেলা কৃষি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানের কৃষি পন্য স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে সারাদেশের চাহিদা মেটাতেও ভূমিকা রাখে। কৃষি পন্যের মধ্যে অন্যতম কাঁচা মরিচ,পিয়াজ, রশুন, টমেটো ও পাট। এই অঞ্চলের মানুষ নিজেদের উৎপাদিত কৃষি পণ্য বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। সম্প্রতি সেই জমিতে মাছের ঘের করার উদ্যোগ নেয় প্রভাবশালী আজিজুল হক, হায়দার আলী, আরিফ হোসেন ও মাসুদ মিয়া। ইতিমধ্যে তারা মাছের ঘেরের জন্য কৃষকদের ৪০০ একর ফসলি জমি দখল নিয়ে রাতের আঁধারে মাটি কাটা শুরু করেছেন। জমির মাঝখানে মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বাঁধ। সেখানে কৃষি জমি পাশাপাশি সরকারের খাস জমিও রয়েছে। জমি গুলো দখল নিতে প্রায় ১০টি বসত বাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ কৃষকরা বাধা দিতে গেলে প্রতিনিয়ত মারধরের হুমকি দিয়ে চলছে তারা। এতে প্রায় দুই শতাধিক কৃষি এখন নিঃস্ব হয়ে গেছেন। জমি দখল ও মাছের ঘের করার বিষয়ে জেলা, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কাছে গত ২৪ নভেম্বর লিখিত অভিযোগ করেন। তবে লিখিত অভিযোগ পেলেও এখনো কোন ব্যবস্থা নেয় নি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
স্থানীয় কৃষক তৌকির আহমেদ শান্ত বলেন, আইজুল ও হায়দার আলীসহ কয়েকজন জোর করে জমির মাটি কেটে ফেলছে। আমরা যে আর চাষাবাদ কিছুই করতে পারুম না। আমি যাতে আমার পোলাপান নিয়ে জমিটা চাষবাস করে খাইতে পারি সে জন্য প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আর্জি জানাই। আমি লিখিত অভিযোগ করেও এখনো প্রশাসনের কাছে কোন সহযোগিতা পাই নি। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের কৃষি জমি গুলো আর রক্ষা করা যাবে না।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আমি সুফিয়ান বলেন, আমি আমার জমিটায় মরিচ চাষ করে সংসার চালাই। এই ১০০ শতক জমি হায়দার আলী দখল করে মাছের ঘের কাটতেছে। আমরা এখন কীভাবে বাঁচব? আমি আমার জমিতে মাছের ঘের করতে দিবো না। জমিতে চাষবাস না করতে পারলে আমার মতো শত,শত কৃষক না খেয়ে মারা যাবে। আমাদের সংসার খরচ চালানোর মতো এই জমি গুলোই শেষ সম্বল। আমি আমার জমি দখল হতে দিমু না।
শুক্রবার বিকেলে নিজের জমির পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন কৃষক আমির হোসেন। তিনি বলেন, তারা রাতের আধারে জমিগুলারে দখলে নিয়ে মাটি কাটতেছে। বাধা দিলেও শুনে না। ঘেরের মাঝখানে কিছু মানুষের জমি দখল নিয়েছে। আর মাটি কেটে বাঁধ দেওয়ার ফলে অন্যসব জমিগুলায় বৃষ্টির পানি জমে যাবে। আমরা ধারদেনা কইরা ফসল করি। এখন জমিগুলাতে আর ফসল ফলানো যাবে না। আমাদের মতো গরীবের কথা কে শুনবো বলেন স্যার? আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি আমার আর কোনো জমি নেই। আমাদের আপনারা বাঁচান।
নিজের বসতবাড়ি হারিয়ে অন্যের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন ৬৫ বছরের আছিয়া বানু। সাংবাদিক দেখে এগিয়ে আসেন তিনি কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলেন,”আমার রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-চোপড় কিছুই তুলতে দেইনি। ভেকু নিয়ে এসে মুহূর্তেই সব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে এখনও ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। আমরা গরিব বলে কী আমাদের কোনো অধিকার নেই? এই ঘরটা আমরা কষ্ট করে বানিয়েছিলাম। এখন পথে বসে গেছি। আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া কথা বলে আজও দেয় নি। তাই বাধ্য হয়ে আমার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। তারা প্রভালশালী তাই কিছু বললে বাচ্চাদের মেরে ফেলবে বলে হুমকি ধামকি দেয় হায়দার আলী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত হায়দার আলী বলেন, প্রশাসন গতবছর অনুমতি দিয়েছে পানি ছিলো তাই কাজ করতে পারি নি। ঘেরের মাঝখানে যাদের জমি পড়েছে তারা প্রথমে ঘের কাটায় রাজি ছিল। তবে, এখন তারা রাজি না। তাই আপাতত মাটি কাঁটা বন্ধ রেখেছি। তবে অনুমতির কপি দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারে নি। ঘরবাড়ি ভাংচুরের অভিযোগে তিনি বলেন এগুলো তারাই সরিয়ে নিয়েছেন আমি ভাংচুর করি নি। ঘাস জমি কি না তা দেখার জন্য সরকার আছেন বলে তিনি এবিষয়ে ভূমি অফিসে খোঁজ নিতে বলেন।
এবিষয়ে গোসাইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বলেন, “স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ওখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তবে পুলিশ গিয়ে কাউকে আটক বা ভেকু মেশিন খুঁজে পায় নি। পুলিশ অভিযানের তথ্য পেয়ে অভিযুক্তরা ভেকু মেশিন সহ পালিয়ে যায়। তাদের ধরতে ভিন্ন উপায়ে কাজ করছেন বলেও জানান ওসি মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন”।
এ ব্যাপারে গোসাইরহাট উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো. রৌশন আহমেদ বলেন, “দু’দিন হলো আমি এই উপজেলায় এসেছি। ইতিমধ্যেই বেশকিছু অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের প্রশাসন কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষি জমিতে অনুমতি ছাড়া কেউ ঘের করতে পারবে না”।
জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম বলেন, “আমাদের কাছে খবর এসেছে কোদালপুর এলাকায় কৃষি জমিতে অনুমতি ছাড়াই মাছের ঘের করা হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বার্তা বাজার/এমএমএইচ





