এক সময় তিতাস-মেঘনার বুক চিরে বয়ে চলতো নানান রঙ্গের স্টিমার-লঞ্চ। নদীতে দাপিয়ে বেরিয়ে রাজত্ব করতো তারা। কিন্তু কালের পরিবর্তনে হারাতে বসেছে লঞ্চের সোনালী দিন। লঞ্চ টার্মিনালে এখন আর নেই সেই কোলাহল, শোনা যায় না হর্নের শব্দ।নদীও যেন ঘুমন্ত । বলছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস-মেঘনা নদীপথে লঞ্চের ফুরিয়ে যাওয়া কথা।
জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগরে ছিল লঞ্চের জংশন। এখান থেকেই ভৈরব, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পথে লঞ্চ চলেছে। ছোট-বড় ৪০-৪৫টি লঞ্চ চলতো এই ৩ রুটে। তিতাস ও মেঘনা নদীবর্তী এই উপজেলায় যাতায়াতের প্রধান বাহনই ছিল লঞ্চ। এখন চলছে ১১টি লঞ্চ। এদিকে ২০০৯ সালের শেষে স্পিডবোট চালু হলে কিছুটা ধাক্কা খায় লঞ্চ ব্যবসায়ীরা। এরপর জেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন দিক দিয়ে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে ৩ বছর আগে নবীনগর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ নরসিংদী-নবীনগর রুটেও লঞ্চ চলাচল। এখন শুধু ভৈরব-নবীনগর পথেই চলছে লঞ্চ।
ঘাটে দেখা মিলল টার্মিনালের টোল আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী খায়ের মিয়ার সাথে। তার চোখ-মুখেই যেন ভাসছে দুরবস্থার চিত্র। যাত্রী নেই। হঠাৎ ২-১ জন এলে তাদের সঙ্গে বচসায় লিপ্ত হচ্ছে। ঘাটে বাঁধা লঞ্চের মাস্টার, সুকানিদের মুখও ভার। পাশের নদীও যেন ঘুমন্ত।
কথা হলে খায়ের মিয়া বলেন, ‘এই লঞ্চটা ভৈরব যাইবো, নিচে ৩ হাজার টাকা খরচ অইবো। লোক মনে-অয় ১০ জনও অইছে না। সংগ্রামের ৪-৫ বছর থেকে লঞ্চ টার্মিনালে রয়েছেন জানিয়ে আরও বলেন, আগে লোক আছিল। তিন লাইনে লঞ্চ চলছে। অহন মানুষ চাইরো বাগুল (চারদিক) দিয়ে যায়গা। মেলাদিন ধইরা এই অবস্থা।’
এম এল মুন্না নামের লঞ্চের মাস্টার জসিম উদ্দিন জানান, এই রুটও আর বেশি দিন চলতো না। আশুগঞ্জ-নবীনগর সড়ক নির্মাণ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এ পথেও আর যাত্রী পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। সড়কটির নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও অটোতে করে এখনই মানুষ চলাচল করছেন। আগে বিকল্প রাস্তা ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় রাস্তাঘাট অইয়া গেছেগা। ট্রলার ছিল না, স্পিডবোট ছিল না। ফেনী বাড়ি জসিমের। ১৭ বছর ধরে একই মালিকের লঞ্চ চালাচ্ছেন।
৩ বছর ধরে এ রুটে লঞ্চ ব্যবসায় মন্দা চলছে জানিয়ে বলেন, ভৈরবে আইতে-যাইতে ১৫ লিটার করে ৩০ লিটার তেল লাগে। যার দাম ৩১শ’ টাকা। সঙ্গে ১ লিটার মবিল। এরপর আছে স্টাফদের হাত খরচ। আপ ডাউনে ৩৫-৪০ জন যাত্রী হয়। আগে ভৈরব আপ ডাউনে ১২-১৩ হাজার টাকা কালেকশন হয়েছে। আর এখন দুই টিপে ৫-৬ হাজারও হয় না।
আগে মালিকরা রুজি করছে, মাসে লাখখানেক টাকা পাইতো। এখন ৩০-৪০ হাজার টাকাও তুলতে পারি না।
আলভী-জীম লঞ্চের মাস্টার মিজানুর রহমান ৪ বছর ধরে এই রুটে আছেন। এর আগে ছিলেন মাওয়াতে। পদ্মা ব্রিজ হয়ে যাওয়ার পর চলে আসেন এখানে।
ফরিদপুর বাড়ি মিজানুর বলেন, আমরা তো অন্য কাজ পারি না। জাহাজের চাকরিটা নেশা। আগে থেকে এইটাই করে আসছি। যারা লঞ্চে-জাহাজে কাজ করে তদের সেদিকেই মন থাকে। দেশ গ্রামে আমাদের কোনো কাজ নেই। কামলা দিবো, এটা তো পারি না। সমাজ-টমাজ আছে। আগে তো ভালোই ছিল। গত ৩ বছর এক রকম ছিল। এই বছর আরও কম। রুটঘাট হওয়ায় সিএনজি অটোতে যায়গা ভৈরবে। সামনে যেয়ে বাসে উঠে পড়ে। দু’-আড়াই ঘণ্টা বসে কে লঞ্চে যায়। সময়ের ব্যাপার স্যাপার আছে। মানুষের হাতে টাকা পয়সাও বেশি। স্পিডবোটে যায়গা ৪০ মিনিটে। আড়াইশ’ টাকা ভাড়া। নবীনগর থেকে ভৈরবের পথে ফাঁড়ি স্টেশনের যাত্রীরাই লঞ্চে ওঠে। ডাইরেক্ট ভৈরবের প্যাসেঞ্জার পাওয়া যায় না। নবীনগর থেকে ভৈরর পথে লালপুর, বাইশমৌজা, গাছতলা, কালিকাপুর, সওদাঘর কান্দি, দুর্গারামপুর- এই ৭টি ঘাটে লঞ্চ যাত্রাবিরতি করে। এসব ঘাট থেকে ৫-৭ জন করে যাত্রী ওঠানামা করে।
নবীনগর থেকে লালপুর যাচ্ছিলেন গোলাপী রানী। ২ ঘণ্টা লাগবে তার লঞ্চে যেতে। তিনি বলেন, মানুষ কম অয়। গাড়ির লাইন অইছে। দুই-চার-পাঁচজন হলে রিজার্ভ নিয়া যায়গা।
রায়পুর- চাঁনপুর ইউনিয়নের সওদাঘর কান্দির ইদ্রিস মিয়া বলেন, তাদের লঞ্চ আর নৌকা ছাড়া যাওয়ার পথ নেই। ব্যবসার দুরবস্থার কারণে মালিকরা লঞ্চ বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টাতেও আছেন। এমএল নাফিসা ৩ বছর ধরে ঘাটে বাঁধা। দরদাম ভালো না হওয়ায় বিক্রি হচ্ছে না।
নদ-নদী ও খাল-বিল এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন‘ তরী বাংলাদেশ’ এর আহবায়ক শামীম আহমেদ বার্তা বাজার কে বলেন, নৌপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থা। সড়কে চাপ কমাতে নৌপথের গুরুত্ব অনেক। সম্প্রতি তরী বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে সারাদেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ সচলের দাবিতে ‘তিতাস থেকে বুড়িগঙ্গা’ একটি নৌযাত্রা করে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাট টার্মিনালে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এসময় উপস্থিত সকলেই বক্তব্যে নৌপথে গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
তিনি আরো বলেন, সরকার থেকে শুরু করে দেশের সচেতন জনসাধারণের উপলব্ধি সড়কে চাপ কমাতে, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নদীই প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও সড়ক উন্নয়ন নামে দেশের নদ-নদীকে অবহেলা করা হয়েছে।ধ্বংসের প্রায় শেষ প্রান্তে আজ নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদী। অথচ দেশের জনসংখ্যা একটি বৃহৎ অংশ এখনো নদীর ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায়ও নদী ভূমিকা অপরিসীম। সরকারের উচিৎ হবে নদীতে প্রয়োজনীয় খননের মাধ্যমে নৌপথ সচল করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সর্বসাধারণের নৌপথে উৎসাহ জোগাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ।
বার্তাবাজার/এমএইচ





