চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী হাজী তোবারক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কান্তি লাল আচার্য্যকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় শুরু হয়েছে প্রশাসনিক তদন্ত। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের চাপেই তার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
শিক্ষক কান্তি লাল জানান, স্কুলের অ্যাডহক কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত। তার মতে, মাইনরিটি হওয়ার কারণেও তাকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “গত বুধবার শতাধিক মানুষ মিছিল নিয়ে স্কুলে আসে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং আমাকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করে। এরপর তারা আমাকে গাড়িতে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এই সময় স্কুল কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ও স্থানীয় বিএনপি সভাপতি নুরুল আনোয়ার উপস্থিত ছিলেন।”
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
অন্যদিকে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আনোয়ার দাবি করেছেন, কান্তি লাল ও তার ঘনিষ্ঠরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি 'দখল করে রেখেছেন' এবং দুর্নীতিতে যুক্ত। তার ভাষায়, “তিনি জনগণের চাপে পদত্যাগ করেছেন। কেউ জোর করেনি।”
তবে কান্তি লাল বলেন, “স্কুলে গঠিত অ্যাডহক কমিটি বোর্ড থেকে ৬ এপ্রিল অনুমোদন পায়। সভাপতি হন মহিউদ্দিন আহমেদ। এরপর থেকেই স্থানীয় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে এবং পহেলা বৈশাখের স্কুল অনুষ্ঠানও বানচাল করে দেয়।”
তিনি আরও জানান, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়, বোর্ড চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। আমি কেবল নিয়ম মেনে কাজ করেছি। তারপরও এভাবে আমার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।”
৩৫ বছর ধরে ওই স্কুলে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত কান্তি লাল বলেন, “আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি। এই পরিস্থিতি শুধু আমার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই হয়েছে।”
অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমি সেই শিক্ষকেরই ছাত্র ছিলাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। আমার ধারণা, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত। আমি চাইলে পরিস্থিতি ভিন্নভাবে সামাল দেওয়া যেত।”
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহম্মদ জানান, তিনি অভিযোগ পেয়েছেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, “কোন শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো সম্পূর্ণ অনৈতিক ও বেআইনি। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় যা যা করা দরকার, তা করা হবে।”
শিক্ষকের মেয়ের ক্ষোভ
ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কান্তি লালের মেয়ে ভাবনা আচার্য্য একটি আবেগঘন পোস্টে লিখেছেন, “আমরা রাতে ঘুমাতে পারছি না। একজন বাবাকে প্রকাশ্যে এভাবে হেনস্তা হতে দেখাটা কতটা কষ্টদায়ক, তা শুধু যারা অনুভব করেছেন তারাই জানেন।”
তিনি লেখেন, “আমার বাবা কখনো অন্যায় করেননি। তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে যেতে রাজি ছিলেন, তবুও স্কুলে গিয়েছিলেন কারণ তিনি পালিয়ে বাঁচতে চাননি। ৩৫ বছরের শিক্ষকতার পর এমন পরিণতি, একজন শিক্ষকের জন্য এটা কতটা অপমানজনক।”
ভাবনা আরও বলেন, “এই সমাজে শিক্ষকরা আজ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। আমরা নিজেরাই যেন নিজের শিক্ষকদের অসম্মান করতে পিছপা হই না। এটা খুবই লজ্জার।”





