আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) অন্দরমহলে এবার প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। নতুন সরকারের হস্তক্ষেপে তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের দিনই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বোমা ফাটান সুলতান মাহমুদ। আর ঠিক তখনই প্রকাশ্যে আসে দেড় মাস আগে সুলতানকে বরখাস্ত করতে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে পাঠানো তাজুলের এক গোপন চিঠি!
সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনালের দুই শীর্ষ আইনজীবীর এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রীতিমতো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে আইনাঙ্গনে।
চিঠিতে সুলতানের বিরুদ্ধে যত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
রেডিও বার্তার হাতে আসা তথ্যানুযায়ী, গত ১১ জানুয়ারি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে একটি চিঠি দেন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। সেখানে তিনি প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদকে অপসারণের জোর দাবি জানান।
চিঠিতে তাজুল অভিযোগ করেন, সুলতান মাহমুদ চিফ প্রসিকিউটরের অনুমতি ছাড়াই ট্রাইব্যুনালের অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে পাচার করছেন, যা বিচারাধীন মামলার জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি। এছাড়া, সাক্ষীদের নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর পরামর্শ ও উসকানি দিয়ে বিচারকাজে বাধা সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
নিরাপত্তারক্ষী ও স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ
সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের চিঠিতে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও উগ্র আচরণেরও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বলা হয়েছে, হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনে লিফটে যাতায়াতের সময় তুচ্ছ কারণে মো. মাঈন উদ্দিন নামের এক নিরাপত্তাকর্মীকে গানম্যান দিয়ে তুলে নিয়ে যান সুলতান। এরপর বার অ্যাসোসিয়েশনের কক্ষে আটকে তাকে বেধড়ক মারধর ও গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এমনকি সুলতান মাহমুদ কথায় কথায় তার গানম্যানদের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিতেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তার এমন আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে চারজন গানম্যান দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি, সুলতান তার স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান এবং এ নিয়ে তার স্ত্রী একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন বলে চিঠিতে দাবি করেন তাজুল ইসলাম।

‘দুর্নীতি ঢাকতেই এই গভীর ষড়যন্ত্র’, পাল্টা দাবি সুলতানের
তাজুল ইসলামের আনা এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে রেডিও বার্তার কাছে দাবি করেছেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তার দাবি, ট্রাইব্যুনালের ভেতরে চলা দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য তিনি জেনে গিয়েছিলেন। সেই তথ্য যাতে তিনি ফাঁস করতে না পারেন, সেজন্যই আগে থেকে এই ‘গল্প’ সাজিয়ে রেখেছিলেন তাজুল ও তার সহযোগীরা।
সুলতান মাহমুদ বলেন, “আমি যদি সত্যিই কোনো অপরাধ করতাম, তবে নিয়ম অনুযায়ী আমাকে শোকজ বা নোটিশ করা হতো। কিন্তু তারা তা করেনি। তাদের দুর্নীতির তথ্য আমি ফাঁস করে দিতে পারি— এই ভয় থেকেই তারা আমার বিরুদ্ধে এই গভীর ষড়যন্ত্র করেছে এবং সময়মতো তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।”
সুলতান মাহমুদ
স্ত্রীকে নির্যাতন এবং তথ্য পাচারের অভিযোগকে ‘ডাহা মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের ওই নিরাপত্তাকর্মী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে আঘাত করেছিল, যার কারণে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন উল্টো ওই কর্মীর বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

প্রেক্ষাপট
প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করলে ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান তাজুল ইসলাম। তিনি এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতাদের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে সম্প্রতি বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সোমবার তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। আর এই নিয়োগ বাতিলের পরপরই দুই পক্ষের এই গোপন কোন্দল প্রকাশ্যে এলো।






