পশ্চিম সুন্দরবনের বৃহত্তম এলাকা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা রেঞ্জে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। পঞ্চপান্ডব নামে পরিচিত এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে জেলে ও বাওয়ালিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেটে চারটি স্টেশনের কর্মকর্তা-বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের মোঃ ফজলুল হক, কোবাদক স্টেশনের মোঃ আনিসুর রহমান, কৈখালী স্টেশনের শ্যামাপ্রসাদ এবং কদমতলা স্টেশনের মনিরুল কবির-জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
বিএলসি ও প্রশাসনিক কাঠামো: সাতক্ষীরা রেঞ্জে চারটি স্টেশন মিলে প্রায় ২,৯০০টি বিএলসি (Boat License Certificate) রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫শ টি মাছ ধরার এবং ১ হাজার ৪শ টি কাঁকড়া আহরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। কদমতলা, কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী ও কোবাদক-এই চারটি স্টেশনের অধীনে একাধিক টহল ফাঁড়ি পরিচালিত হয়, যা পুরো রেঞ্জের কার্যক্রম তদারকি করে।
অভয়ারণ্যে প্রবেশে ঘুষের অভিযোগ: মানিক চড়া, পান্তা মারি, খেজুর দানা, ইলিশমারী, পানির খাল, কামানদাঙ্গা, তালপটি, তালতলী, জলঘাটা, কয়লা, বাহির মান্দারবাড়িয়া ও আঠারো বেকি সহ বিভিন্ন অভয়ারণ্য এলাকায় জেলেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এসব এলাকায় জেলে ও বাওয়ালিদের প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়। আর এ ঘুষের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক জেলে মহাজনী ঋণের ফাঁদে পড়ছেন। একদিকে বনদস্যুর আতঙ্ক, অন্যদিকে বন বিভাগের ঘুষ-দুই চাপেই তাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
ঘুষের নির্ধারিত হার: ভুক্তভোগী জেলেদের দাবি, প্রতি ১৫ দিনের গণ হিসেবে বিভিন্ন খাতে নিম্নোক্ত হারে ঘুষ আদায় করা হয়-ফাঁস জাল নৌকা ৮হাজার টাকা, চরপাটা ১২ হাজার টাকা, খালপাটা ৫ হাজার টাকা, বরশি/দোন ৬ হাজার টাকা,
কাঁকড়া ধরার নৌকা ৫ হাজার টাকা, স্টেশন ভিত্তিক ‘ডিউটি খরচ’ প্রতি নৌকা ৫০০ টাকা, লাইন খরচ’ ১ হাজার টাকা।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তারা গণের মাঝামাঝি সময় সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে এসব অর্থ আদায় করেন।
জেলেদের বক্তব্য: গাবুরা এলাকার রবিউল ইসলাম, নয়ন এবং কৈখালির বাবুলসহ একাধিক জেলে জানান, খোলা বনে মাছ ও কাঁকড়া কম পাওয়ায় আমরা মহাজনের টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। ঋণ থেকে মুক্তি পেতে বাধ্য হয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করতে হয়। সেখানে ঢুকতে বনদস্যুদের পাশাপাশি বন বিভাগের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। প্রতি গণে প্রায় ১৪ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়, কিন্তু অনেক সময় সেই খরচও উঠে না।
টাকার লেনদেনের অভিযোগ: তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘুষের একটি বড় অংশ রেঞ্জ কার্যালয়ের হিসাব রক্ষক এর মাধ্যমে এসিএফ এর কাছে পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি স্টেশন থেকে মাসিক প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা চারটি স্টেশন মিলিয়ে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। নির্ধারিত অর্থ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি রাজস্ব হার উপেক্ষার অভিযোগ: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব হার হলো- চিংড়ি প্রতি কুইন্টাল ৫০০ টাকা, কাঁকড়া প্রতি কুইন্টাল ৭৫০ টাকা, সাদা মাছ প্রতি কুইন্টাল ৬৪০ টাকা, রূপচাঁদা, ভেটকি ও পাঙ্গাস প্রতি কুইন্টাল ২,৪০০ টাকা, নৌকা থেকে মাছ ধরার জন্য জনপ্রতি ১৫ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও গুনতে হয় বাড়তি টাকা।
কিন্তু জেলেদের অভিযোগ, পাস ইস্যুর সময় কাঁকড়া ও চরপাটা পাসে মাথাপিছু ৩৯০ টাকা এবং ফাঁস জালের পাসে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়, যা সরকারি নির্ধারিত ফি থেকে বহুগুণ বেশি।
হাইকোর্টের নির্দেশনা: ২০১৯ সালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কাঁকড়া পরিবহনের অনুমতি চেয়ে জাহান আলী গাজী সহ আটজন নৌকা মালিক হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে, সুন্দরবনে প্রবেশের আগে দিনের বেলায় প্রতিটি নৌকায় কঠোর তল্লাশি চালাতে হবে এবং জেলেদের করণীয় ও দণ্ডনীয় বিষয় সম্বলিত হ্যান্ডবিল সরবরাহ করতে হবে।
বন বিভাগের বক্তব্য: এ বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ মশিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভয়ারণ্যে কোনো প্রকার মাছ বা কাঁকড়া ধরার নৌকা প্রবেশের সুযোগ নেই। যদি কেউ টাকার বিনিময়ে এমন সুযোগ করে দেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, স্টেশন ভিত্তিক ঘুষ আদায়ের অভিযোগও সঠিক নয়।
সুশীল সমাজের দাবি: সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের দাবি, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জেলে-বাওয়ালিদের জীবন-জীবিকা নিরাপদ করতে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
বার্তা বাজার/এস এইচ






