মানুষের সেবাই পরম ধর্ম—এই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করে সুদূর স্পেন থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। এসেছিলেন একজন ধর্মযাজক হিসেবে, কিন্তু তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছেন ভালুকার অসংখ্য মানুষের আপনজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সামাজিক উন্নয়নে নিরলস কাজ করে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ধর্মযাজক ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার প্রত্যন্ত নলুয়াকুড়ি গ্রামে তাঁর হাত ধরে বদলে গেছে হাজারো মানুষের জীবন। ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের সবুজে ঘেরা নলুয়াকুড়ি গ্রাম। এখন সেখানে শিক্ষা ও মানবসেবার নানা প্রতিষ্ঠান চোখে পড়ে। অথচ ১৯৯১ সালে যখন স্পেনের নাগরিক ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ প্রথম এখানে আসেন, তখন এলাকাটি ছিল নদীবেষ্টিত, দুর্গম ও নানা সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত। জাভেরিয়ান মিশনারি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার তনিনো ডিসেমব্রিনো।
এলাকার মানুষের দুর্ভোগ দেখে তাঁরা প্রথমেই হাত দেন যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে। নিজেদের উদ্যোগে লাউতি নদীর ওপর নির্মাণ করেন একটি সেতু, যা বিচ্ছিন্ন নলুয়াকুড়িকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। স্থানীয়রা বলছেন, সেটিই ছিল এই অঞ্চলের উন্নয়নের প্রথম বড় পদক্ষেপ।
১৯৯৬ সালে সহযোদ্ধা ফাদার তনিনোর মৃত্যু হলেও থেমে যাননি ফাদার বেঞ্জামিন। বরং তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করেই এগিয়ে নিয়েছেন মানবসেবার কর্মযজ্ঞ। কারিতাস বাংলাদেশের সহযোগিতায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছেন একটি মানবিক আবাসন প্রকল্প, যেখানে আশ্রয় পেয়েছে শতাধিক ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার।
শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষার জন্য নলুয়াকুড়ি টেকনিক্যাল স্কুল। বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ২৫ শয্যার ফাদার তনিনো মেমোরিয়াল হাসপাতাল। পথশিশু ও অসহায় কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্মাণ করেছেন পৃথক আবাসিক হোস্টেলও।
ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ বলেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে আমি ভালুকা উপজেলার আওলাতলী গ্রামে বসবাস করছি। এখানকার মানুষ, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমি গভীরভাবে মিশে গেছি। অবসর গ্রহণের পর জীবনের বাকি সময়টুকুও এখানেই কাটিয়ে দিতে চাই। সরকার যদি আমাকে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়, তবে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে থেকে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।’
তাঁর এই ভালোবাসা ও আত্মত্যাগে মুগ্ধ স্থানীয় মানুষও। স্থানীয় বাসিন্দা জোসেফ বাবু বলেন, ‘ফাদার বেঞ্জামিন শুধু একজন ধর্মযাজক নন, তিনি মানবতার সেবায় নিবেদিত এক আলোকবর্তিকা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে ভালুকার মানুষের ভালোবাসার মধ্যেই থাকতে চান।’
আবাসন প্রকল্পের সুবিধাভোগী বার্নাড সাংমার স্ত্রী বলেন, ‘ফাদার আমাদের বিনামূল্যে ঘর করে দিয়েছেন। এখানে শতাধিক পরিবার তাঁর সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। আমার তিন মেয়ের পড়াশোনার সব খরচও তিনি বহন করছেন।’
চিকিৎসাসেবা পাওয়া সনাতন ধর্মালম্বীর অনুসারী একজন পুরুষ বলেন, ‘পা ভেঙে যাওয়ার পর আমার দুইবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। পুরো চিকিৎসা ব্যয়ও ফাদার দিয়েছেন। আমরা সনাতন ধর্ম পালন করি, কিন্তু কখনো ধর্ম পরিবর্তনের কথা বলেননি। ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রেখেই তিনি সবাইকে সহযোগিতা করেন।’
নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, ‘এই স্কুলে শুধু ভালো পড়াশোনাই নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চারও সুযোগ রয়েছে। এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য হাসপাতাল এবং পথশিশুদের জন্য আবাসিক হোস্টেল আমাদের বড় প্রাপ্তি।’
খুলনা ও নওগাঁ থেকে এসে আবাসন সুবিধা পাওয়া কয়েকজন বাসিন্দাও জানান, ‘ফাদার বেঞ্জামিনের সহায়তায় তাঁরা ভাড়া বাসার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। শুধু মাথার ওপর একটি ছাদই নয়, তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগও নিশ্চিত হয়েছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায়ও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ।
ধর্ম-বর্ণের বিভাজন ভুলে একজন বিদেশি মানুষ কীভাবে একটি জনপদের মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন, ভালুকার নলুয়াকুড়ি তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজের এই দীর্ঘ মানবিক অবদান ভালুকায় উন্নয়ন, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বহুদিন।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ





