চারপাশে যখন মানবিকতা হারানোর হাহাকার, নিজের স্বার্থে সন্তান যখন বাবা-মায়ের দায়িত্বের প্রতি উদাসীন, তখন মায়ের প্রতি ভালোবাসার অন্যরকম এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন আলমগীর হোসেন (৪৫)। অভাব ও মায়ের অসুস্থতার কারণে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে গেলেও তিনি দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি। নিজে অসুস্থ হয়েও একাই দেখাশোনা করছেন ৯০ বছরের বৃদ্ধা মায়ের।
শ্রমিকের কাজ করা আলমগীর হোসেন কাজ থেকে ফিরে মায়ের দেখাশোনা করেন। কাজে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা দিযে যান। মা বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করলে ফিরে এসে তিনিই পরিষ্কার করেন। তবে নিজের অসুস্থতার জন্য কখনো কাজে না যেতে পারলে সেদিন আর খাবার জোটে না মা-ছেলের।
নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা না পেয়ে জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অশীতিপর জাহেরা বেগম (৯০) ও তার ছেলে আলমগীর হোসেন। একেতো ঘরে খাবার নেই, রুগ্ন শরীর নিয়ে থাকার ঘরটিও জরাজীর্ণ। শেষ জীবনে এসে তিনি সরকারের কাছে খাবার ও চিকিৎসার পাশাপাশি থাকার ঘরটি মেরামতের দাবি জানিয়েছেন।
জাহেরা বেগম নেত্রকোনা শহরের সাতপাই রেল কলোনি এলাকার মৃত দেওয়ান আলীর স্ত্রী। প্রায় এক দশক আগে তার স্বামী মারা গেছেন। তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় তাজউদ্দিন ও ছোট ছেলে ময়না মিয়াও পাঁচ বছর আগে মারা যান। মেজো ছেলে আলমগীর হোসেন (৪৫) শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনিই জাহেরাকে দেখাশোনা করেন।
বুধাবার (১০ জুন) বিকেলে সাতপাই রেলকলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৮ ফুট প্রস্থ ও ১৪ ফুট দৈর্ঘ্যের ছোট একটি টিনের ঝুপড়ি ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। কাছে যেতেই নাকে আসে দুর্গন্ধ। দরজা খুলতেই চোখে পড়ে ভাঙা একটি চৌকিতে অপরিচ্ছন্ন বিছানায় শুয়ে আছেন বৃদ্ধ জাহেরা বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধা হাঁটতে পারেন না, উঠে বসতেও কষ্ট হয়। দু-একটি কথা বলেন, তাও অস্পষ্ট।
অভাবের কারণে নিয়মিত খাবার জোটে না, বন্ধ হয়ে গেছে চিকিৎসাও। ঘরের চাল ও বেড়ার টিন ফুটো হওয়ায় রোদ-বৃষ্টি খুব সহজেই ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে আসবাবপত্র বলতে একটি ভাঙা টেবিল ও চেয়ার, সিলভারের একটি কলসি ও ছড়ানো অবস্থায় কিছু থালা-বাসন। যেন ঘরটিতে মৃত্যুর জন্য নীরবে অপেক্ষা করছেন জাহেরা বেগম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, বছর দশেক আগেও জাহেরার সংসার ভালোই চলতো। স্বামী দেওয়ান আলী নেত্রকোনা খাদ্যগুদামে শ্রমিকের কাজ করতেন। ছেলেরাও শ্রমিকের কাজ করে যা আয় করতেন তা দিয়ে ৯ সদস্যের সংসার মোটামুটি চলছিল। কিন্তু হঠাৎ স্ট্রোকে দেওয়ান আলীর মৃত্যু হলে পরিবারটি বড় ধাক্কা খায়।
সেই শোক কাটতে না কাটতেই বছর সাতেক আগে বড় ছেলে তাজউদ্দিন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর তিন বছর পর ছোট ছেলে ময়না মিয়াও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
অভাবের কারণে ভাঙন শুরু হয় সংসারে। বর্তমানে জাহেরা বেগমের দেখাশোনা করছেন তার মেজো ছেলে আলমগীর হোসেন। কিন্তু তিনিও নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত কাজ করার সক্ষমতা নেই। ফলে মা-ছেলের সংসারে নিত্যদিনই লেগে থাকে অভাব।
আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়নের পর বড় ভাই ক্যানসারে ও ছোট ভাই হার্টের সমস্যায় মারা যান। মারে লইয়া আমি একাই আছি। চিকিৎসা করনের মতো টেহা নাই। নিজেও অসুস্থ। কাম করতে গেলে মারে ঘরের দরজা বন্ধ কইরা যাওন লাগে। প্রায় দেড় বছর ধইরা মা বিছানায় পায়খানা-প্রস্রাব করে। মানুষের সাহায্যে নিয়া কোনো রকমে চলি। সাহায্য না পাইলে না খাইয়া থাকতে হয়।’
কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে তার। তিনি জানান, মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও সংসারের অভাব-অনটনের কারণে স্ত্রীও এক বছর আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
প্রতিবেশী রমজান মিয়া বলেন, ‘জাহেরা বেগম বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা করেন। সারাদিন সেভাবেই পড়ে থাকেন। আলমগীর যখন কাজ করতে যান, তখন বৃদ্ধা একা থাকেন। রাতে ফিরে এসে তিনি সব পরিষ্কার করেন। অনেক সময় খাবার কেনার টাকাও থাকে না। তখন মা-ছেলেকে না খেয়েই থাকতে হয়। অনেক সময় আমরা সাধ্য মতো সহযোগিতা করি।’
আরেক প্রতিবেশী খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘এই পরিবারটির কষ্ট না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ৯০ বছরের বৃদ্ধা মা বিছানায় পড়ে আছেন। ছেলেটাও অসুস্থ। অনেক সময় তাদের ঘরে খাবার থাকে না। খুব মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।’
এ বিষয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘পরিবারটির অসহায় অবস্থার কথা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তিনি বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। আমরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।’
বার্তা বাজার/এস এইচ






