চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তার ঘটনায় অভিযুক্ত সেই ওসি আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশের অভিযোগ, মো. সুমন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদর দপ্তরে (দামপাড়া পুলিশ লাইনস) হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের আহত করেছিলেন। সেই মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তবে স্থানীয় বিএনপির নেতা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে আত্মীয়কে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়ে যান সুমন। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর বডিগার্ডের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা দাবি করেন ওসি আরিফুর রহমান। না দেওয়ার মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সুমনকে। ভুক্তভোগী সুমন নগরীর আকবরশাহ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য।
এদিকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তার ঘটনায় সিএমপির খুলশী থানার বিতর্কিত সেই ওসি আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার রাতে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানা গেছে। একইসঙ্গে খুলশী থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ সোলাইমানকে। যিনি বাকলিয়া থানার ওসি পদে রয়েছেন।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালের দিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পরিদর্শক আরিফুর রহমান দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এলাকায় কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন। তার আশীর্বাদপুষ্ট এই পুলিশ কর্মকর্তা ওই সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০২১-২০২২ সালে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ওসি ছিলেন আরিফুর। ওই সময় ওই এলাকার চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন সরকারের কাছ থেকে স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ১ লাখ টাকা ঘুস নিয়েছিলেন। বিষয়টি পরবর্তীতে জানাজানি হলে পুলিশ সদর দপ্তর তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেয়। পরবর্তীতে সিএমপির বিশেষ শাখায়ও কাজ করেন তিনি।
দেবিদ্বার থানায় ওসি থাকাকালে আরিফুর রহমান আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংগঠনটির গুণগানে মত্ত ছিলেন। এ ধরনের ভিডিও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হলে হঠাৎ নিজেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা বলে পরিচয় দিতে থাকেন তিনি। এই পরিচয় ব্যবহার করে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি পদ বাগিয়ে নেন তিনি। সেখানেও ভূমি দখল এবং মাদককারবারিদের সহায়তার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনও করে ভুক্তভোগীরা।
এছাড়া নিজের সহকর্মী ও পার্শ্ববর্তী থানা পাঁচলাইশের ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানকে নিয়ে বিষোদগার করেন তিনি। তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে ওসি আরিফের একটি কথোপকথন ছড়িয়ে পড়লে সহকর্মীকে নিয়ে তার নানা আপত্তিকর মন্তব্য শোনা যায়।
আকবরশাহ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে সুমনের দুইজন আত্মীয় ‘ফয়েজ লেক গেস্ট হাউজে’ উঠেছিলেন। ওই সময় পুলিশ হোটেলে অভিযান চালায়। খবর পেয়ে সেখানে যাওয়ায় পুলিশ সুমনকেও থানায় নিয়ে যায়। এ বিষয়ে ওসি আরিফুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে সুমনের পরিচয় দিয়েছিলাম। তিনি (ওসি) ছেড়ে দিবেন জানিয়ে পরদিন শুক্রবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে প্রেরণ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘যে মামলায় সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ওই মামলায় উল্লেখিত সময়ে সে দামপাড়া নয় আকবরশাহ থানাধীন ফয়’স লেক এলাকায় ছিল। তখন আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম। ওই সময় ফয়’স লেক থেকে একটি মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সুমনকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ওই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।’
সুমনের গ্রেফতার স্বারকে উল্লেখিত মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে জানা যায়, তিনি নগরীর ৯নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন।
সুমনের গ্রেফতার বিষয়ে মো. হানিফ নামে ওই স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে জানানো হয়েছে বলে স্মারকে মামলার আইও খুলশী থানার এসআই মো. আবদুল মতিন উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে মো. হানিফ বলেন, ‘সুমনের আত্মীয় সমস্যায় পড়েছে শুনে আমিও হোটেলে এসেছিলাম। এ সময় পুলিশ আমাকে ও সুমনকে আটক করে। পরে ওসির বডিগার্ড মো. মেজবাহ আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে আমাকে রেখে সুমনকে থানায় নিয়ে যায়। সুমনের পরিবার তাকে ছাড়ানোর জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওসিকে দিতে চেয়েছিলেন। এরপরও তাকে ছাড়েনি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘এ বিষয়ে ওসি সাহেবের কথা বলেন।’
তবে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানার জন্য আরিফুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ শুক্রবার রাতে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে পুলিশের একটি টিম খুলশী থানায় নিয়ে যায়। বিমানবন্দর থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে নগরীরর লালখান বাজার এলাকায় নাঈম হাসানের গাড়ি আটক করে পুলিশ। এ সময় পরিচয় দেয়ার পরও পুলিশ সদস্যরা তাকে মারধর করেন। থানায় নেওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় নাঈম হাসানকে হেনস্তা করেন ওসি আরিফুর রহমান। তাকে আসামি উল্লেখ করে চোখ নিচে নামিয়ে কথা বলতে ধমক দেন।
এ ঘটনা দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠার পর শনিবার রাতেই ওসিকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। নাঈম হাসানের বাবা সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম ওসিসহ জড়িতদের শাস্তির দাবি করেন।






